স্বর্গে গিয়েও এখন ধান ভানে না ঢেঁকি : প্রযুক্তির চাপে হারিয়েছে কালের গর্ভে |The4thcolumn

অচেনা গুপ্ত, দ্য ফোর্থ কলাম, ১৪ জানুয়ারি’২০২০ :-

ছবি সৌজন্য – অন্তর্জাল

সে ‘স্বর্গও নেই’ , সে ‘ঢেঁকিও নেই ‘ । এবং নেই সেই ধান ভানা । রয়ে গেছে শুধু প্রবচন-প্রবাদ । ভোরের নীরবতা ভেঙে শোনা যেত ঢেঁকির ‘ঢেঁকুর’ ‘ঢেঁকুর’ আওয়াজ। গ্রামে গৃহস্থের বাড়িতে সকাল সকাল শুরু হত ধান ভাঙার কাজ। এসব কিছুই আজ ইতিহাস। যান্ত্রিক সভ্যতার হানায় হারিয়ে গিয়েছে ধান ভাঙার একমাত্র পুরোনো মাধ্যম ঢেঁকি। পৌষ পার্বণ ও ঢেঁকির মধ্যে যে একটা আলাদা সম্পর্ক ছিল, তা এখনও ভোলেননি গ্রামের গৃহস্থরা। অতীতে পৌষ পার্বণে পিঠে-পুলি তৈরির প্রস্তুতি শুরু হত কয়েকদিন আগে থেকেই। ঢেঁকিতে তৈরি করা চালের গুঁড়ো দিয়ে গ্রামের ঘরে ঘরে তৈরি হতো পুলি, পাটিসাপটা, চিতই-এর মতো নানা ধরনের সুস্বাদু পিঠে-পুলি। পিঠের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ত গোটা গ্রামজুড়ে। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামেও যেন অনেকটা শহুরে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকা গুলিতেও এখন আর ঢেঁকির দেখা মেলে না। প্রবীণদের কাছে ঢেঁকি এখন যেন স্মৃতি। পৌষ পার্বণে পিঠে-পুলি তৈরির রীতি রয়ে গেলেও হারিয়ে গিয়েছে ঢেঁকি। আধুনিক যুগে যেমন মেশিনে তৈরি চালের গুঁড়ো কিনতে পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি বাজারে মেলে রেডিমেড পিঠে-পুলি। এভাবেই নীরবে-নিঃশব্দে হারিয়ে গিয়েছে ঢেঁকির ব্যবহার।

কুমারগ্রাম ব্লকের বারবিশার বাসিন্দা অখিল দাস আক্ষেপের সুরে জানান, ‘বহুদিন আগের কথা। সেসময় বাড়িতে ঢেঁকি ছিল। গ্রামের অনেকেই ঢেঁকিতে চাল গুঁড়ো করে নিয়ে যেতো। পৌষ পার্বণের সঙ্গে ঢেঁকির একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সভ্যতার জাঁতাকলে ঢেঁকি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ঢেঁকি কী, নবীন প্রজন্মের অনেকেই তা জানে না। বর্তমান সময়ে পৌষ পার্বণ রয়ে গেলেও, ঢেঁকির ব্যবহার আর নেই।’

কামাখ্যাগুড়ি এলাকার বাসিন্দা সুভাষ দাস জানান, ‘পৌষ পার্বণে পিঠে-পুলি বানানোর জন্য ঢেঁকির ব্যবহার দুই দশক আগেও লক্ষ্য করা গিয়েছে। কিন্তু এখন গোটা গ্রামে একটি ঢেঁকি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ধান ভাঙা থেকে শুরু করে চালের গুঁড়ো তৈরির জন্য সবাই এখন মেশিন ব্যবহার করে। তাই ঢেঁকি এখন ইতিহাস।’

প্রবীণদের অনেকেই জানান, একসময় অন্যান্য এলাকার সঙ্গে কুমারগ্রাম ব্লকের গ্রাম গুলির প্রায় সব সম্ভ্রান্ত বাড়িতেই একটি করে ঢেঁকি ছিল। কয়েক দশক আগেও গ্রাম গুলিতে ঢেঁকি চোখে পড়েছে। ধান ভাঙার কল আমদানির পর গ্রামাঞ্চল থেকে ঢেঁকি বিলীন হওয়া শুরু হয়। ফলে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ভুলে গিয়েছেন ঢেঁকিছাঁটা চালের স্বাদ। এককথায় যান্ত্রিক সভ্যতা গ্রাস করে ফেলেছে ঢেঁকিকে।

সভ্যতার প্রয়োজনে মানুষের হাত ধরে ঢেঁকি তৈরি হয়েছিল। আবার সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি নির্ভর সমাজে মানুষের হাত ধরেই ঢেঁকি বিলুপ্ত হয়েছে। একদা গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে ব্যবহৃত ঢেঁকি আজ ইতিহাস।

Leave a Reply

error: Content is protected !!