এ এক ঘরে ফেরার গান ! ১২ বছর পর বাড়ি ফিরল হারিয়ে যাওয়া মেয়ে |The4thcolumn

কস্তুরী ভৌমিক , দ্য ফোর্থ কলাম, ২৫ জানুয়ারি’২০২০ :-

ঠাকুরমার ঝুলির সেই গল্পটা শুনেছেন ? যে গল্পে রাজকুমারীকে ধরে নিয়ে যায় দুষ্টু রাক্ষস । তারপর বহুদিন পর, কোনো এক সাহসী রাজকুমারের পারদর্শিতায় রাক্ষসবংশ ধ্বংস হয়, ঘরে ফেরে রাজকুমারী । আমাদের আজকের গল্পও এইরকমই ঘরে ফেরার । পার্থক্য বলতে প্রথমত, গল্পের প্রোটাগনিস্ট সুশেনা ওরাও রাজকুমারী নয়, সে এক চা শ্রমিকের মেয়ে ; দ্বিতীয়ত, আজকের রাজকুমারীদের যুদ্ধ জয়ে আর কোনো রাজকুমার লাগে না ! উদাহরণ , এই গল্পের সুশেনা ওরাও ।

দীর্ঘ বারো বছর পর আজ বাড়ি ফিরল সুশেনা ওরাও | এখন তার বয়স পঁচিশ । বাড়িতে খুশির আমেজ । পাড়ার লোকের মুখে মুখে ফিরছে মেয়ের সাহসিকতার গল্প । কাকতালীয়ভাবে আজ, ২৪শে জানুয়ারি, বিশ্ব শিশুকন্যা দিবস ! কিন্তু এই বাড়ি ফেরার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের কাহিনী । লড়াইটা আপেক্ষিক হলেও অসম , তাতে সন্দেহ নেই ।

২০০৮ সাল, ডিসেম্বর মাস ; আলিপুরদুয়ার সংলগ্ন চুনিয়াঝোরা চা বাগিচায় কাজ করে এলারুস ওরাও বাগিচার কাছেই বড়া লাইন এলাকায় তার পরিবার । সেখানেই ছিল তার তেরো বছর বয়সী মেয়ে সুশেনা । ডিসেম্বরেই কোনো এক ব্যক্তি কুমতলবে কাজের প্রলোভন দিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে যায় সুশেনাকে । সাধাসিধে শ্রমিক পরিবার তখন এই কুমতলবের কিছুই বুঝতে পারেনি । পরে মেয়ের সাথে সবরকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে হুশ হয় এলারুসের পরিবারের । কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার চা শ্রমিক এলারুস কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না তার করনীয় । দ্বারে দ্বারে অসহায় হয়ে ফেরে । অবশেষে ২০১৬ সালে সে খোঁজ পায় এক সহৃদয় ব্যক্তির, যিনি নারী পাচার রুখতে বিভিন্ন কল্যানকামী কাজকর্ম করে থাকেন । সেই সহৃদয় ব্যক্তি এলারুসের হয়ে মিসিং ডায়েরি দায়ের করেন শামুকতলা থানায় ।

এই দীর্ঘ বারোটি বছর কোথায় কিভাবে ছিল সুশেনা ? সে জানিয়েছে এখান থেকে যাওয়ার পর যেখানে তাকে রাখা হয় সেখানে বিভিন্নরকম চাপের মুখে পড়তে হয় তাকে । সাহস সঞ্চয় করে সেখান থেকে পালিয়ে যায় সে । তারপর দিল্লি, নয়ডা, গ্রেটার নয়ডা বিভিন্ন যায়গায় ঘুরে ঘুরে কাজ করে সে, পরিচারিকার কাজ । এইভাবেই চলতে চলতে কষ্ট করে একটি মোবাইল ফোন কেনে সে । বাড়ি ফিরতেই হবে তাকে । খুঁজে পেতেই হবে বাড়ির লোক । সুশেনা সাহায্য নেয় ফেসবুকের ।সেখান থেকেই সে খুঁজে পায় তার এক আত্মীয়কে । তার মাধ্যমেই পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে আজ ফিরে আসে সুশেনা । তার বন্ধুস্থানীয় এক সহৃদয় ব্যক্তি তাকে বাড়ি পৌছে দেয় । এলারুস থানায় জানিয়েছেন যে তার মেয়ে অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরে এসেছে ।

সুশেনার মতোই বাড়ি ফিরুক তার মতো অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া হাজার হাজার সুশেনা । বাড়ির উঠোন জুড়ে হেসে খেলে বড়ো হোক মেয়েরা ! আগামীর সূর্য উঠুক তাদের হাত ধরেই ! সুশেনাদের হাত ধরে ।

Leave a Reply

error: Content is protected !!