ভুবন মাঝি, দ্য ফোর্থ কলাম, ০২ডিসেম্বর’২০২০:-

শীতকাল কমলালেবু ছাড়া এককথায় অসম্পূর্ণ।সুমিষ্ট, রসালো, সুস্বাদু আদি সাইট্রাস ফ্রুট হিসেবে সারা পৃথিবীতেই কমলালেবু অত্যন্ত জনপ্রিয়।ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে দার্জিলিংয়ের কমলালেবুর গরিমার সামনে আর কোনো জায়গার কমলালেবু ফল হিসেবে কখনোই পাত্তা পায়নি। আকারে-প্রকারে দার্জিলিংয়ের কমলালেবুরই জগৎ প্রসিদ্ধি বেশি। এর সঙ্গে ডুয়ার্সের কমলালেবুও কম যায় না।
আলিপুরদুয়ার জেলাঅঞ্চলের বিখ্যাত পাহাড়ী এলাকা বক্সা, লেপচাখা, রূপমভ্যালি স্থানগুলি।
বক্সার প্রবেশদ্বার সান্তলাবাড়ি বা সান্ত্রাবাড়ি। ‘সান্ত্রা’ বা ‘সুনতারা’ অর্থাৎ ডুকপা ( কাছাকাছি নেপালী, ভুটিয়া) ভাষায় কমলালেবু। কমলালেবু, মানে একটি স্থানীয় গাছফলের নামে এন্তার এলাকার নামকরণ হয়ে যাওয়া ইতিহাসে খুব কমই পেয়েছি আমরা। অবশ্য সান্ত্রাবাড়ির সেই কমলালেবুর হাজারো গাছভর্তি ফলের মোহনমনোহর রূপ দেখেছেন ইংরেজ আমলের বাসিন্দেরা। শেষ ছবি পাওয়া গিয়েছিল সাতের দশকের গোড়ার দিকে। তারপর থেকে অঞ্চলটিতে কমলালেবুর গাছ পিছু হটতে হটতে এখন তো তিন হাজার ফুট উচ্চতার রূপমভ্যালির দিকে সরে গেছে। এইটি বিশ্ব উষ্ণায়নের একটি হাতেগরম দৃষ্টান্ত। সান্ত্রাবাড়ি এখন শুধু নামটুকু বুকে নিয়ে অতীতস্মৃতি রোমন্থন করে চলেছে।
এবারের শীতেও বিস্তীর্ণ এলাকার ডুয়ার্স বাসীর ভরসা হয়ে উঠলো ভুটানের কমলালেবু। পরিবর্তন পরিস্থিতি ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দলগাঁও-বীরপাড়ার বাসস্ট্যান্ড এলাকাতে শীতের প্রথম স্পর্শ সঙ্গে করেই পাড়ি দিতে হাজির ভুটানী কমলা, ভারত হয়ে বাংলাদেশ। পাতলা খোসা, রসে ভরপুর পাহাড়ি সুবর্ণগোলক। বীরপাড়া অঞ্চলে ভুটানের কমলালেবুকে এই নামেই ডাকা হয়। দার্জিলিংয়ের কমলালেবু যেহেতু দূর অস্ত। ভরসার জায়গা নিচ্ছে ভুটানের কমলালেবু। ভারতে ভুটানি কমলার বড়ো প্রবেশদ্বার সংলগ্ন শহর জয়গা- ফুন্টশোলিং। আবার কমলাপ্রিয় ক্রেতাদের হাতে উঠে আসছে কাছের জায়গা মাদারিহাট- বীরপাড়া ব্লকের টোটোপাড়ার কমলালেবু। স্বাদে ও গন্ধে বিস্তর ফারাক থাকলেও এ নিয়েই তৃপ্ত তাকতে হচ্ছে ডুয়ার্সবাসীকে।
দার্জিলিংয়ের কমলালেবু আগের মতো হাত বাড়ালেই পাওয়া-না-যাওয়ার আফশোস-অসন্তুষ্টির ভিতর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতোন বাজারে হাজির, আরেকটি ফল। সুদূর পাঞ্জাব থেকে ‘কিনো’ নামে একধরনের কমলাজাতীয় ফল এসে বাজারের অনেকটাই দখল করে বসে আছে। ফারাক বুঝতে না পেরে ক্রেতাদের অনেকেই কমলালেবু ভেবে ‘কিনো’ কিনে ঠকে যাচ্ছেন। ডুয়ার্সের বীরপাড়া, বানারহাট, ধূপগুড়ি, ময়নাগুড়ি, মাদারিহাট, আলিপুরদুয়ার, কামাখ্যাগুড়ি সহ বিভিন্ন এলাকার ফলের দোকানে দেখা যাচ্ছে, কমলালেবুর পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে কিনো। কমলালেবুর চেয়ে অনেকবেশি উজ্জ্বল এবং মোটা কিনোর খোসা। কিনোর কোয়াগুলি একটি অপরটির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে লেগে থাকে। ছাড়াতে গেলে অনেক সময় ছিঁড়ে যায়। স্বাদে তুলনামূলক ভীষন টক। বাইরে থেকে ফারাক বোঝা দায়। দামেও লাগসই। ষাট-সত্তর টাকার বিনিময়ে কিনো মিলছে আট-নয়টি করে। যেখানে, দিব্যবস্তুর মতো দার্জিলিংয়ের কমলা সামনে দর্শন পেলে একশ টাকার বিনিময়ে মিলছে তিন-চারটে।
বাজারে দার্জিলিংয়ের কমলালেবুর আকাল সন্ধান করতে জানা গেল, কিছু কথা। শিলিগুড়ির দুয়েক জায়গায় দার্জিলিংয়ের কমলালেবু পাওয়া গেলেও ডুয়ার্স- তরাই ও ভাবর অঞ্চলে সেগুলি মিলছে না।
কারণ বেশিরভাগ কমলালেবু কলকাতা সহ ভিনরাজ্যে রপ্তানি করা হচ্ছে। এছাড়া, দার্জিলিংয়ের কমলালেবুর একটা বড়ো অংশ রপ্তানি হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে। স্বাভাবিকভাবেই দার্জিলিংয়ের কমলালেবুর স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ডুয়ার্সের মানুষ।
এদিকে দার্জিলিংয়ের কমলালেবুর বিষয়ে সম্প্রতি খবর নিয়ে জানা গেল নিজের জন্মস্থানেই পরিস্থিতি ভালো নয়। কয়েক বছর ধরেই কমলালেবুর আকার ক্রমশ ছোটো হয়ে চলেছে। চলতি বছরে কমলালেবুর উৎপাদন যেমন কম হয়েছে তেমনই আকারও ছোটো হতে হতে পাতিলেবুর মতো হয়ে গিয়েছে। কমলাচাষীদের মাতায় হাত। এদিয়েই তাদের রুজিরুটির সংস্থান। জিটিএ-এর উদ্যান পালন বিভাগ নাগপুর থেকে বিশেষজ্ঞ আনিয়ে পরামর্শ করছে। এক সময় কমলালেবু বিক্রি করে চাষীরা এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত মুনাফা পেয়েছেন। একেকটি কমলালেবুর ওজন পেয়েছেন, ২০০ গ্রাম পর্যন্ত। কমলাচাষীদের বাগান, আগের ২০০/২৫০ গাছের জায়গায় এখন ৮০-১০০ গাছে এসে দাঁড়িয়েছে। আকার ছোটো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাদ, গন্ধ, রস হারিয়ে যাচ্ছে।
দার্জিলিংয়ের কমলালেবু বলতে বোঝায়, মূলত দার্জিলিং পাহাড়ের কার্সিয়াং এবং মিরিক মহকুমাতে চাষ হওয়া কমলালেবু উৎপাদনকে। সিটং, শেলপু, মংপু, টুংলু, সৌরিনী, মিরিক বস্তি এলাকাগুলি কমলালেবু উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু চাষীদের আক্ষেপ, কয়েক বছর ধরে ফল সেভাবে আসছে না।
দার্জিলিংয়ের চা এবং কমলালেবু পৃথিবী বিখ্যাত। প্রচুর পর্যটক কমলালেবুর বাগান দেখার জন্য মিরিকে আসেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে কমলালেবুর যা দশা হয়েছে তা হতাশ করার মতো। এভাবে চললে আর চার- পাঁচ বছর পর দার্জিলিংয়ের কমলালেবু বলে কিছুই থাকবে না।
আশার কথা কমলালেবুর উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই ক্রমবর্ধমান সমস্যাটি এখন সরকারী স্তরে মাথা ঘামানো হচ্ছে। পাহাড়ের কমলালেবুর পুনরুজ্জীবনের জন্য বড়োভাবে সরকারী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উদ্যান পালন বিভাগকে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আমরা উত্তরবঙ্গবাসী হিসেবে এই প্রত্যাশা করব, দার্জিলিংয়ের কমলালেবু তার পুরোনো ঐতিহ্য তাড়াতাড়ি ফিরে পাবে।
