নিউজ ডেস্ক, দ্য ফোর্থ কলাম, ২৬ ডিসেম্বর ‘১৯ :-

প্রাণের প্রেয়সীর সাথে পরপুরুষের ফষ্টিনষ্টি কেন সহ্য করবে উদ্দাম প্রেমিক?তাও আবার জঙ্গলের আড়ালে? এক নধর মাদি ও ঘাড়মোটার মধ্যে যখন ওই লীলাখেলা চলছিল তখনই জঙ্গল ফুঁড়ে সেখানে হাজির হয় টারজান।আদতে ওই মাদির প্রকৃত প্রেমিক। অনেকটা হুমকির ঢংয়ে মাটিতে পা দাপড়ে সে ঘুসবৈঠি ওই ঘাড়মোটাকে হুঁশিয়ার করারও চেষ্টা করে।কিন্তু তাতে তোয়াক্কা করেনি প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া ওই ঘাড়মোটা।ওই অবজ্ঞায় রেগে কাঁই হয়ে ওঠে ঘর ভাঙার ভয়ে শঙ্কিত টারজান।অগত্যা শুরু হয় পেশির আস্ফালন।শীতের পারদ চড়ায় চারদিক যখন যবুথবু তখন আগুনে মেজাজ নিয়ে বেইমান ঘাড়মোটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে টারজান।টারজানের বেমক্কা মারে কুপকাত হয় ঘাড়মোটা।শেষে বেঘোরে প্রাণটাই যায় ঘাড়মোটার।অপরাধ, টারজানের সঙ্গিনীকে ফুঁসলে নিয়ে যাওয়ার মতলব এঁটেছিল ওই বয়স্ক পুরুষ গন্ডার।তাতে মাথায় খুন চেপে বসে মস্তান টারজানের।প্রায় পাঁচ ঘন্টার রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের শেষে যোগ্যতম হিসেবে জয়ি হয় টারজান।গরুমারা অথবা জলদাপাড়ায় পুরুষ গন্ডারদের মধ্যে সঙ্গিনী দখলের প্রাণঘাতী লড়াই এখন যেন রোজনামচা হয়ে দাঁড়িয়েছে।কখনও লড়াই হয়েছে গরুমারার সাদাশিং ও ছোটোঘাড়মেটার মধ্যে।কখনও বোতলশিখ আর কানহেলা, কখনও টারজান সাদাশিং।এমন ঘটনার ইয়ত্তা নেই।একসময় গরুমারার গন্ডারদের আকৃতি ও আচরণের মধ্যে প্রভেদ দেখে প্রায় একক চেষ্টায় ওই গন্ডারদের অদ্ভুত নামকরণ করেছিলেন তৎকালিন ডিএফও তাপস দাস। বড়দিনের সকালে গরুমারা জাতীয় উদ্যানের মেদলার জঙ্গলের তিন নম্বর কম্পার্টমেন্টে ঘাড়মোটার রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করেন বনকর্মীরা।ওই লড়াইয়ে বেশ খানিকটা জখম হয়েছে টারজানও।দূর থেকে ওই জখম গন্ডারের উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে বনদপ্তরের তরফে।ঘাড়মোটার মৃতদেহের ময়নাতদন্তে কোনো রকম গুলির চিহ্ন না মেলায় বনকর্তারা নিশ্চিত যে, ওই গন্ডারটির মৃত্যুর পেছনে চোরাশিকারীদের কোনো যোগসাজশ নেই।টারজানের বেপরোয়া মার সহ্য করতে না পেরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ওই বৃদ্ধ গন্ডার ঘাড়মোটা।কিন্তু হালফিলে গরুমারা ও জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে গন্ডারদের সঙ্গিনী দখলের ওই মারন লড়াই বাড়ার কারন কি? ওই প্রশ্নের উত্তরে উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণ শাখার মুখ্যবনপাল উজ্জ্বল ঘোষ জানিয়েছেন “জলদাপাড়া ও গরুমারায় গন্ডারদের পুরুষ-মাদি সমানুপাতিক হার ১ঃ১ এ পৌঁছে গিয়েছে।কিন্তু গন্ডারদের জীবনশৈলি ও মনস্তত্ত্ব অনুসারে প্রত্যেকটি পুরুষ গন্ডার পিছু তিনটি করে মাদি গন্ডার থাকা প্রয়োজন। স্বাভাবিক কারনেই ওই সমানুপাতিক হারে গলদ দেখা দেওয়ায় সঙ্গিনী দখলের লড়াইয়ে পুরুষ গন্ডাররা বেশি বেশি লিপ্ত হতে শুরু করেছে।তবে ওই প্রবণতা যথেষ্ঠ উদ্বেগের।” বিষয়টি মাথায় রেখেই কোচবিহারের রাজ আমলের মৃগয়া ক্ষেত্র পাতলাখাওয়ার রসমতি বনাঞ্চলে রাজ্যে গন্ডারদের তৃতীয় আবাসভূমি গড়ে তোলার কাজে হাত দিয়েছে বনদপ্তর।উদ্দেশ্য একটাই জলদাপাড়া ও গরুমারা থেকে গন্ডারদের ভিড় কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া।কিন্তু রাজনৈতিক ডামাডোলের কারনে ওই পরিকল্পনা শুরুর আগেই ভেস্তে যায়।তবে রাজ্যের প্রধান মুখ্যবনপাল রবিকান্ত সিনহা জানিয়েছেন “আমাদের দপ্তরের উদ্যোগে রসমতি নিয়ে রাজনৈতিক জটিলতার অবসান হয়েছে।আশা করছি নতুন ইংরেজি বছরের জানুয়ারী মাসের মধ্যেই সেখানে গন্ডার ছাড়া সম্ভব হবে।আমাদের সমস্ত প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।” জলদাপাড়া ও গরুমারায় পুরুষ গন্ডারদের সঙ্গিনী দখলের লড়াইয়ের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় রীতিমত উদ্বিগ্ন গন্ডার বিশেষজ্ঞরা।এশিয়ান রাইনো গ্রুপের চেয়ারম্যান ও অসমের আন্তর্জাতিক গন্ডার গবেষক বিভব তালুকদার জানিয়েছেন “এমন ঘটনা যে ঘটতে পারে তা নিয়ে আমরা পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তরকে আগাম সতর্ক করেছিলাম পাঁচ বছর আগে।আমাদের আশঙ্কা যে মিথ্যে ছিল না, তার প্রমাণ কিন্তু হাতে গরমে মিলতে শুরু করেছে।কারন বছরের পর বছর ধরে সমজিন গোত্রীয় গন্ডারদের মধ্যে প্রজননের ফলে সমানুপাতিক হারের ওই বৈষম্য আরও প্রকট হতে শুরু করেছে।যা বড়ই দুশ্চিন্তার বিষয়।”
