হাতি -বুলডোজারে লড়াই : জলাধারে পড়ে যাওয়া হস্তীশাবক বাঁচিয়ে স্বস্তির শ্বাস বক্সা বাঘ বনে |The4thcolumn

নিউজ ডেস্ক, দ্য ফোর্থ কলাম, ৯ ডিসেম্বর’১৯ :-

ছবি – শেষ অবধি জলাধার থেকে উঠেছে হস্তীশাবক

সোমবারের ব্যস্ত চা বাগানের ভোর । সূর্য তখনও দেখা দেন নি । ঘন্টা দুয়েক পরেই ডুয়ার্সের এই ভুটান পাহাড় পাদদেশের চা বাগিচার ঘুম ভাঙবে কর্মব্যস্ত দিন শুরুর সাইরেনের শব্দে । কিন্তু এদিন তার আগেই জেগে উঠল এই চা বাগিচা । আকাশ কাঁপানো হাতির ডাকে । আবহমান কাল ধরে জঙ্গলের ও বন্যপ্রাণীর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করা ভর্ণবাড়ি চা বাগান বাসিন্দারা জংলী শব্দ ভালোই চেনেন । কাজেই , বুনো হাতির করুন আর্তনাদ চিনতে তাদের লেশমাত্র সময় লাগে নি । বিপদ ঘটেছে বুঝতে পারেন কালচিনির ভার্ণোবাড়ি চা বাগানের বাসিন্দারা। বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প লাগোয়া ভার্ণোবাড়ি বিটের কাছে ছিল চা বাগানের এক জলাধার।সেখানেই অসাবধানে পড়ে গিয়েছিল এক বছর খানেকের হস্তি শাবক।ভোর আবছা আলোয় দেখা গেলো বাগানের বারো নম্বর সেকশনের ওই  জলাধারটি ঘিরে রয়েছে বুনো হাতির দল।আপ্রাণ চেষ্টায় শাবকটিকে উদ্ধারের চেষ্টায় ছিল তারা।খবর যায় বনদপ্তরে।লোকলস্কর আর দুটি পোল্লায় বুলডোজার নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন হ্যামিলটনগঞ্জ রেঞ্জের বনকর্মীরা। ততক্ষণে ফর্সা হয়েছে চারপাশ।হাতির শাবককে চাক্ষুষ করতে হাজার জনতার ভীড়। ঘড়ি ধরে সকাল সাড়ে সাতটায় উদ্ধার পর্ব শুরু করে বনদপ্তর।হলুদ রংয়ের দুই যন্ত্রদানবকে দেখা মাত্রই দলের অন্য সদস্যরা একে একে গা ঢাকা দিলেও ঘটনাস্থলেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে মা হাতিটি।আকাশের দিকে শূঁড় তুলে হুমকি দিতে থাকে দুই বুলডোজারকে।ওই জলাশয়ের দিকে তারা আগুয়ান হতেই মাটিতে পা আছড়ে ওই মা হাতি সরাসরি তেড়ে আসে বুলডজার গুলির দিকে।ততক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে যন্ত্রদানব আর বন্য মা হাতির অসম লড়াই।অপত্য সন্তান স্নেহে তার তখন পাগলপারা আচরণ।প্রতিবাদে বার বার ডজারের মাথায় নিজের মাথা ঠুকে চলেছে ওই মা।বনকর্মী আর জনতার চিলচিৎকার, ডজারের গগনবিদারী হওয়াজে কোনো তোয়াক্কাই নেই তার।পরিস্থিতি বেচাল বুঝে বেশ কয়েকবার পিছিয়েও যেতে হয় ডোজার বাহিনীকে।কারন তখন ওই মা হাতি রাগে শঙ্কায় এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল যে, যে কোনো মুহুর্তেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো।ততক্ষণে শীতের জলাশয়ে হাবুডুবু খেতে খেতে অনেকটাই কাহিল হয়ে পড়েছিল ওই অসহায় হস্তিশাবকটি।সেই চিন্তাতেও উদ্বেগের পারদ চড়তে শুরু করেছিল বনকর্তাদের।তখন আচমকাই ক্ষেপে গিয়ে ওই মা হাতি চা বাগানের বেশ কিছু ছায়া গাছ উপড়ে ফেলে।ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় একের পর এক বিদ্যুতের পোল।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে ওই মা হাতিকে ঘটনাস্থল থেকে হটাতে অগত্যা শূন্যে গুলি ছোড়ার সিদ্ধান্ত নেন বনকর্মীরা।গুলির আওয়াজে সাময়িক ভাবে ওই মা হাতি পিছু হটলেও বুলডোজার ওই পাকা জলাশয়ের দিকে আগুয়ান হতেই পড়িমরি করে ছুটে এসে সরাসরি সে মাথা দিয়ে আঘাত করতে শুরু করে পে লোডারে।এরপরেই গুলির মাত্রা বাড়িয়ে দেন বনকর্মীরা। তাতেই ঘাবড়ে গিয়ে জলাশয় থেকে প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে গোটা উদ্ধার পর্বে নজর রেখে চলেছিল সে।সুযোগ পেয়েই অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় জলাশয়েের দেওয়াল ভেঙে ওই শাবককে ডাঙায় উঠতে সাহায্য করেন বনকর্মীরা। ঘড়ির কাটা তখন সাড়ে দশটায় গড়িয়ে গিয়েছে।পে লোডারের ধাক্কা ও বনকর্মীদের লাগানো মোটা দড়ির সাহায্যে মাটির নাগাল পেয়ে এক ঝটকায় জল থেকে উঠে আসে জলে খাবি খাওয়া ওই শাবক।চোখের নিমেষে চা বাগানের পথ ধরে মায়ের পায়ের নিচে গিয়ে নিশ্চিন্তে বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়।টানা তিন ঘন্টার রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের শেষে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন বনকর্মী থেকে শুরু করে উপস্থিত জনতা।

ছবি – বুলডোজারকে চ্যালেঞ্জ মা-হাতির

ইতিপূর্বেও চা বাগানের জলাধারে হাতির বাচ্চা পড়ে যাওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর জলাধার গুলিতে ঢেকে রাখার অনুরোধ জানিয়েছিল বনদপ্তর।কিন্তু তাতে যে চা বাগান কর্তৃপক্ষের কোনো হেলদোল নেই সোমবার ভার্ণোবাড়ি চা বাগানের ঘটনায় তা আবার প্রমাণিত হ’ল।বাগানের ম্যানেজার আর কে শর্মা জানিয়েছেন “গোটা উদ্ধার পর্বে আমাদের বেশ কিছু ক্ষতি হলেও শেষ পর্যন্ত শাবকটি মায়ের কাছে ফিরে যাওয়াতে নিশ্চিন্ত লাগছে।ভবিষ্যতে আমরা ওই জলাধার গুলিকে ঘিরে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।” উদ্ধার পর্ব  সফল হওয়ায় স্বস্তির হাওয়া  বনদপ্তরে।বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের ক্ষেত্র অধিকর্তা শুভঙ্কর সেনগুপ্ত জানিয়েছেন “পরিস্থিতির বিচারে আমরা ঐরাবত গাড়ি ও চারটে কুনকি হাতিকে প্রস্তুত রেখেছিলাম।আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিলো ওই শাবককে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।সে ক্ষেত্রে সর্বক্ষণের জন্য আমাদের সাবধান থাকতে হয়েছে যাতে ও কোনোভাবেই মানুষের সংস্পর্শে না চলে আসে।একবার তা হলেই দল আর ওই শাবককে ফিরিয়ে নিতো না।যা হয়েছে তা ভালই হয়েছে।” 

Leave a Reply

error: Content is protected !!