নিউজ ডেস্ক, দ্য ফোর্থ কলাম, ১৬ মার্চ ২০২৬ :

প্রকৃতির পরম বন্ধু ব্যাঙ: বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের সুরক্ষায় নীরব প্রহরী
প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাসে প্রতিটি জীবেরই সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে, হোক তা বিশাল হাতি কিংবা ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ। কিন্তু আমাদের চারপাশে থাকা এমন একটি উপকারী প্রাণীকে আমরা প্রায়শই অবজ্ঞা করি, এমনকি ঘৃণা করি—সেটি হলো ব্যাঙ। যদিও এদের আপাতদৃষ্টিতে খুব আকর্ষণীয় মনে হয় না, কিন্তু ব্যাঙ প্রকৃতি এবং মানুষের জন্য কল্পনার চেয়েও বেশি উপকার করে। ব্যাঙ কেবল জলাশয়ের শোভা নয়, বরং এরা বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জীবন্ত সূচক এবং আমাদের ফসল ও স্বাস্থ্যের নীরব রক্ষক।
পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক শিকারি:
ব্যাঙের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ। এরা হলো প্রকৃতির দক্ষ শিকারি। একটি পূর্ণবয়স্ক ব্যাঙ প্রতিদিন তার শরীরের ওজনের সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি ওজনের কীটপতঙ্গ খেতে পারে। এই খাদ্য তালিকায় রয়েছে মশা, মাছি, পঙ্গপাল, বিভিন্ন ধরনের বিটল, এবং ফসলের জন্য ক্ষতিকর লার্ভা। ফসল বিধ্বংসী কীটপতঙ্গ খেয়ে এরা কৃষি উৎপাদনে সাহায্য করে, ফলে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কম হয়, যা পরিবেশের জন্য চূড়ান্ত মঙ্গলজনক।
রোগ প্রতিরোধে ব্যাঙের ভূমিকা:
আজকাল ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আমরা সবাই জানি। এই রোগগুলোর বাহক হলো মশা। আর এই মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যাঙের ভূমিকা অতুলনীয়। ব্যাঙের লার্ভা বা ব্যাঙাচি জলাশয়ে মশার ডিম এবং লার্ভা খেয়ে এদের বংশবৃদ্ধি শুরুতেই ধ্বংস করে দেয়। পূর্ণবয়স্ক ব্যাঙও প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মশা খায়। অর্থাৎ, ব্যাঙের উপস্থিতি সরাসরি আমাদের মাবাহিত রোগ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ও খাদ্যশৃঙ্খল:
ব্যাঙ প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। ব্যাঙাচিগুলো জলাশয়ের শৈবাল পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, পূর্ণবয়স্ক ব্যাঙ সাপ, বিভিন্ন বড় পাখি (যেমন বক, চিল), এবং কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রধান খাদ্য। ব্যাঙ না থাকলে এই শিকারি প্রাণীগুলো খাদ্যসঙ্কটে পড়বে, যা সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে দেবে।
পরিবেশের স্বাস্থ্য সূচক:
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ব্যাঙকে ‘পরিবেশের স্বাস্থ্য সূচক’ বলা হয়। এদের ত্বক খুব পাতলা এবং সংবেদনশীল হওয়ায় পরিবেশের সামান্য দূষণ বা পরিবর্তন এরা সহ্য করতে পারে না। কোনো জলাশয়ে যদি ব্যাঙের সংখ্যা কমতে শুরু করে, তবে বুঝতে হবে সেই পানি বা পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ, ব্যাঙের উপস্থিতি আমাদের জানিয়ে দেয় যে আমাদের পরিবেশ সুস্থ আছে কি না।
সুতরাং, ব্যাঙকে অবজ্ঞা নয়, বরং এদের বাসস্থান রক্ষা করা এবং প্রকৃতিতে এদের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব। ব্যাঙ ভালো থাকলে প্রকৃতি ভালো থাকবে, আর প্রকৃতি ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকব।