হার মেনেছে বয়স! ভিনি ভিডি ভিসি! ৩৮-এও অধরা মেসি! The 4th Column

জারুল রাভা, দ্যা ফোর্থ কলাম, ১৭ জুন ২০২৬ :-

–ভিনিভিডিভিসি! ইট’স মেসি!

ফুটবল কখনও কখনও পরিসংখ্যানের গণ্ডি ছাড়িয়ে মহাকাব্যে পরিণত হয়। আর সেই মহাকাব্যের নাম যদি হয় লিওনেল মেসি, তাহলে বিস্ময়ের আর কোনো সীমা থাকে না। সময়ের স্রোত বয়ে যায়, ঋতু বদলায়, প্রজন্ম বদলায়; কিন্তু কিছু কিংবদন্তি আছেন, যাঁরা সময়কে নিজেদের ইচ্ছেমতো বাঁকিয়ে দেন। লিওনেল মেসি ঠিক তেমনই এক বিস্ময়, যাঁর গল্প যত পুরোনো হয়, ততই নতুন হয়ে ওঠে।
৩৮ বছর বয়সে এসে যখন অধিকাংশ ফুটবলার ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায় দাঁড়িয়ে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করেন, তখন মেসি যেন নতুন সূর্যোদয়ের গল্প লিখছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০তম ম্যাচ—যে সংখ্যা নিজেই একটি ইতিহাস—সেই মাইলফলককে তিনি রূপ দিলেন এক অনন্য শিল্পকর্মে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে তিনি যেন আবারও প্রমাণ করলেন, “পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে”—এই বাংলা প্রবাদটি তাঁর ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি সত্য।
উত্তর আমেরিকার মাটিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ জে-র ম্যাচটি ছিল আর্জেন্টিনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মেসির জন্য ছিল আরও বিশেষ। কারণ এটি ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ২০০তম অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা তিনি লিখলেন সোনালি অক্ষরে।
ম্যাচের ১৭ মিনিটে দূরপাল্লার এক দুর্দান্ত শটে জালের ঠিকানা খুঁজে নেন তিনি। যেন শিল্পীর তুলির আঁচড়ে আঁকা কোনো নিখুঁত ছবি। দ্বিতীয়ার্ধে আবারও প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বোকা বানিয়ে দ্বিতীয় গোল করেন। আর ৭৬ মিনিটে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে যেন ঘোষণা দিলেন—“সিংহ বুড়ো হলেও শিকার করতে ভোলে না।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।” মেসির ফুটবল যেন সেই পঙ্‌ক্তিরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি। চাপ, প্রত্যাশা, সমালোচনা—কোনো কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিবারই তিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন, নিজের প্রতিভার আলোয় আলোকিত করেছেন ফুটবল বিশ্বকে।
এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা পৌঁছেছে ১৬-তে। স্পর্শ করেছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। যে রেকর্ড একসময় অনেকের কাছে ছিল দূর আকাশের তারা, মেসি সেটিকে হাতের মুঠোয় এনে দেখালেন। যেন “ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয়”—এই চিরন্তন সত্যের জীবন্ত উদাহরণ তিনি।
২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এটাই হয়তো তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু মহানায়কেরা বিদায় নেন নিজেদের সময়ে, অন্যের কল্পনায় নয়। তাই চার বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে এসে তিনি যেন বললেন, গল্প এখনও শেষ হয়নি।
আর্জেন্টিনার শিরোপা রক্ষার অভিযানের শুরুটা হয়েছে দুর্দান্ত জয়ে। কিন্তু এই জয়ের চেয়েও বড় গল্প হলো একজন কিংবদন্তির অবিনাশী স্পৃহা। বয়স তাঁর শরীরে সংখ্যা লিখতে পারে, কিন্তু প্রতিভার উপর কোনো রেখা টানতে পারে না।
ফুটবলের ইতিহাসে অনেক মহান খেলোয়াড় এসেছেন, অনেকেই গেছেন। কিন্তু কিছু নাম সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে চিরন্তন হয়ে ওঠে। লিওনেল মেসি সেই চিরন্তনতারই আরেক নাম। তিনি শুধু গোল করেন না, তিনি স্মৃতি তৈরি করেন। তিনি শুধু ম্যাচ জেতান না, তিনি প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখান।
আর তাই বলা যায়—যতদিন ফুটবল থাকবে, ততদিন মেসির গল্পও বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে, ইতিহাসের পাতায় এবং অসংখ্য স্বপ্নবাজ শিশুর চোখে।

Leave a Reply

You cannot copy content of this page

error: Content is protected !!