ইসলামাবাদে ইরান-মার্কিন শান্তি বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামাতে বিশ্বনেতাদের নজর এখন পাকিস্তানে | The 4th Column

ইসলামাবাদে শান্তির খোঁজে: ইরান-মার্কিন আলোচনার নেপথ্যে পাকিস্তান
​নিউজ ডেস্ক, দ্য ফোর্থ কলাম, ৯ এপ্রিল ২০২৬ :-

— পাকিস্তানের দিকে তাকিয়ে গোটা বিশ্ব

বিশ্ব রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। গত কয়েক মাস ধরে চলা ইরান ও ইসরায়েল-মার্কিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এবার শান্তির টেবিলে বসতে যাচ্ছে বিবাদমান পক্ষগুলো। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের আমন্ত্রণে শনিবার থেকে ইসলামাবাদের সুরক্ষিত ‘রেড জোন’-এর সেরেনা হোটেলে শুরু হচ্ছে এই উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা। একদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু এবং অন্যদিকে বিশ্ববাজারে তেলের আকাশছোঁয়া দাম—সব মিলিয়ে এই বৈঠক বর্তমান বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
​আলোচনার কেন্দ্রে যারা
​এই শান্তি আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে চলেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ১৫ বছর পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান সফরে এলেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। পাকিস্তান এই আলোচনার মূল সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছে, যেখানে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সরাসরি মধ্যস্থতা করবেন।
কেন পাকিস্তানই কেন্দ্রবিন্দু?
​ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে এই আলোচনার জন্য পাকিস্তানকেই সবচেয়ে উপযোগী মনে করা হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এবং ভারতে ও পাকিস্তানে বড় শিয়া জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি তেহরানের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের মতো পাকিস্তানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই, যা ইরানের আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়েছে। ২০০৪ সাল থেকে পাকিস্তান আমেরিকার একটি ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ বা প্রধান সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও দুই দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।
টেবিলে থাকছে যেসব শর্ত
​ইরান এই আলোচনার জন্য ১০ দফা প্রস্তাব পেশ করেছে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ইরানের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করা। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউজ সূত্রে জানা গেছে, আমেরিকা চাইছে ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সম্পূর্ণ ত্যাগ করুক। যদিও এই শর্তটি নিয়ে এখনো কোনো ঐক্যমত্য হয়নি।
লেবানন: আলোচনার প্রধান অন্তরায়
​শান্তি আলোচনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লেবানন ইস্যু। গত বুধবার লেবাননে ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলায় ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যদি ইসরায়েল লেবাননে হামলা বন্ধ না করে, তবে তারা এই যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসবে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জেডি ভ্যান্স মনে করছেন যে, বর্তমান যুদ্ধবিরতির শর্তাবলীর মধ্যে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন ইস্যুটি আমেরিকা এবং ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্কেও ফাটল ধরাতে পারে।
জটিল সমীকরণ ও অনিশ্চয়তা
​কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার অভাবই এই আলোচনার সবচেয়ে বড় অন্তরায়। ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি এক কামরায় না বসে আলাদা আলাদা কক্ষে বসবেন এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বার্তা বহন করবেন। ইসরায়েল এই আলোচনায় সরাসরি অংশ না নেওয়ায় চূড়ান্ত সমাধান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ জানান, আলোচনার পরিবেশ শুরু হওয়ার আগেই কিছুটা বিষাক্ত হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার কারণে।
উপসংহার
​দীর্ঘ ১৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এই আলোচনা। যদিও এখনই কোনো চূড়ান্ত সমাধান প্রত্যাশা করা কঠিন, তবে দুই পক্ষ যদি একে অপরের সর্বোচ্চ দাবিগুলো থেকে কিছুটা সরে আসে, তবে হয়তো হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া বা পরমাণু ইস্যুতে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। পুরো বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ইসলামাবাদের মার্গাল্লা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সেরেনা হোটেলের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

You cannot copy content of this page

error: Content is protected !!