নাদির শাহ: এক সাধারণ রাখাল থেকে পারস্যের অপরাজেয় সম্রাট | The 4th Column

নিউজ ডেস্ক, দ্য ফোর্থ কলাম, ১৬ মার্চ ২০২৬ :

নাদির শাহ: এক সাধারণ রাখাল থেকে পারস্যের অপরাজেয় সম্রাট
ইতিহাসে অনেক দিগ্বিজয়ীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকলেও, পারস্যের নাদির শাহের মতো অভাবনীয় উত্থান খুব কম শাসকের ভাগ্যেই জুটেছে। তাকে বলা হয় ‘পারস্যের নেপোলিয়ন’ বা ‘দ্বিতীয় আলেকজান্ডার’। ১৭৩৬ সালে তিনি পারস্যের (বর্তমান ইরান) আফশারীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। তার জীবন একদিকে যেমন সামরিক সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছেছিল, অন্যদিকে তার শাসনকাল ছিল চরম রক্তক্ষয়ী ও নিষ্ঠুরতায় মোড়া।
উত্থান ও ক্ষমতারোহণ
১৬৮৮ সালে এক অতি সাধারণ দরিদ্র রাখাল পরিবারে নাদির শাহের জন্ম। শৈশবে তাকে ও তার মাকে উজবেক দস্যুরা দাস হিসেবে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নিজের বুদ্ধিমত্তা আর অদম্য সাহসের জোরে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন এবং একটি ডাকাত দলের সর্দার হন। পরবর্তীতে তার অসামান্য রণকৌশলের কারণে তিনি তৎকালীন পারস্যের সাফাভিদ শাসকদের অধীনে উচ্চপদে আসীন হন। ১৭১২ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে পারস্যের শাহ ঘোষণা করেন।
ভারত অভিযান ও দিল্লির পতন
নাদির শাহের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত এবং ট্র্যাজিক অধ্যায় হলো ১৭৩৯ সালের ভারত অভিযান। তৎকালীন মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের অযোগ্যতার সুযোগ নিয়ে নাদির শাহ খাইবার পাস দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। ঐতিহাসিক কারনালের যুদ্ধে মোগলদের বিশাল বাহিনীকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ধূলিসাৎ করে দেন নাদির শাহ।
দিল্লি দখলের পর একটি গুজবকে কেন্দ্র করে তিনি সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ ‘কাতলে আম’ বা গণহত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেন। একদিনেই প্রায় ৩০ হাজার নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারায়। দিল্লি পরিণত হয় এক রক্তগঙ্গার শহরে।
সম্পদ লুট: ময়ূর সিংহাসন ও কোহিনূর
নাদির শাহ যখন দিল্লি ত্যাগ করেন, তখন তিনি ভারতের কয়েক শতাব্দীর সঞ্চিত সম্পদ লুট করে নিয়ে যান। তার লুণ্ঠিত সম্পদের তালিকায় ছিল বিশ্ববিখ্যাত ‘কোহিনূর’ হীরা এবং ‘দরিয়া-ই-নূর’। এছাড়াও তিনি মোগলদের আভিজাত্যের প্রতীক ‘তখত-ই-তাউস’ বা ময়ূর সিংহাসন সঙ্গে করে পারস্যে নিয়ে যান। বলা হয়, এই লুটের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, নাদির শাহ তার সাম্রাজ্যে পরবর্তী তিন বছরের জন্য সমস্ত কর মওকুফ করে দিয়েছিলেন।
শেষ জীবন ও পতন
সামরিকভাবে তিনি অপরাজেয় থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন চরম নিষ্ঠুর ও সন্দেহপ্রবণ। তার এই সন্দেহপ্রবণতা এতই বেড়ে গিয়েছিল যে, নিজের বড় ছেলে রেজাকুলি মির্জাকে তিনি অন্ধ করে দিয়েছিলেন। শেষ জীবনে তার মানসিক অস্থিরতা ও নিষ্ঠুরতা অসহনীয় হয়ে উঠলে, ১৭৪৭ সালে তার নিজের দেহরক্ষীরাই তাকে তাবুতেই হত্যা করে।
নাদির শাহের মৃত্যুতে তার বিশাল সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে, কিন্তু ইতিহাসে তিনি থেকে যান এক অদম্য যোদ্ধা এবং ভারতের ইতিহাসের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডির নায়ক হিসেবে।

Leave a Reply

You cannot copy content of this page

error: Content is protected !!