অদূরে হাতির দল : নদী বাঁধকে বিছানা করে বেঘোরে ঘুম মদ্যপ ঝালমুড়ি বিক্রেতার
নিউজ ডেস্ক , দ্যা ফোর্থ কলাম, ২৬ আগষ্ট ২০২৫ :-
মাদারিহাট: সময়টা ছিল সোমবার গভীর রাত। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর তার মাঝেই ভেসে আসছে বুনো হাতির দলের গম্ভীর বৃংহণ। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের বনকর্মীরা তখন রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রে। তাঁদের লক্ষ্য, এই বুনো হাতির দলকে লোকালয়ে ঢোকার আগেই জঙ্গলে ফেরত পাঠানো। পটকা ফাটানো হচ্ছে, সার্চলাইটের আলোয় চারদিক ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর কেউ কেউ তো বন্দুক তাক করে তৈরি!
এরমধ্যে হঠাৎই জামতলার তিতি নদীর বাঁধের উপর বনকর্মীদের নজর আটকে যায়। দেখেন, এক যুবক পড়ে আছেন। পাশে ঝালমুড়ির টিন আর সাইকেল। তাঁদের বুঝতে বাকি থাকে না যে এটি কোনো সাধারণ দৃশ্য নয়। প্রাথমিক অনুমান, নিশ্চিতভাবেই হাতির দলের হাতে বলি হয়েছেন এই ঝালমুড়ি বিক্রেতা।
বনকর্মীরা যখন প্রায় শিউরে উঠেছিলেন, তখনই আসল চমক। সাহসিকতার চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যখন তাঁরা সেই যুবকের কাছে পৌঁছলেন, তখন তাঁদের চোখ কপালে। যুবক মদ্যপ অবস্থায় বেঘোরে ঘুমোচ্ছেন! হাতি তো দূরের কথা, যেন পৃথিবী উল্টে গেলেও তাঁর ঘুম ভাঙবে না।
এবারে শুরু হলো আসল চ্যালেঞ্জ। হাতির দলকে তো দূরে রাখতেই হবে, তার সাথে এই ‘ঘুমন্ত কুম্ভকর্ণ’কে ঘুম থেকে ওঠানোর চেষ্টা। বনকর্মীরা ডাকাডাকি করলেন, ঝাঁকালেন, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। ওদিকে, হাতির দল তাদের দিকে এগিয়ে আসায় মেজাজ হারাতে শুরু করেছে। প্রায় দেড় ঘণ্টার ব্যর্থ চেষ্টার পর, বনকর্মীরা বাধ্য হয়ে তাঁকে চ্যাংদোলা করে নিরাপদ জায়গায় তুলে নিয়ে যান।
এরপরই নাটকীয়ভাবে ঘুম ভাঙে ওই যুবকের। জানা যায়, তাঁর নাম সালিম আনসারি, বাড়ি মাদারিহাটের পূর্ব খয়েরবাড়ি। মঙ্গলবার বিকেলে ফুটবল খেলা উপলক্ষে ঝালমুড়ি বিক্রি করতে গিয়ে তিনি ‘আকন্ঠ’ মদ্যপান করেন। এরপর নদী বাঁধের উপর নিজের বিছানা ভেবেই বেহুঁশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।
বনকর্মীরা তাঁকে নিজেদের গাড়িতে ‘জামাই আদরে’ বাড়ি পৌঁছে দিয়ে কার্যত হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। কারণ, ডুয়ার্সে এমন ঘটনা নতুন নয়। এর আগে বহু মদ্যপ ব্যক্তি হাতির সামনে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন বা প্রাণ হারিয়েছেন। জলদাপাড়া বনবিভাগ তাই মাস তিনেক আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন মদ্যপ ব্যক্তিদের দেখলে তাঁদের উদ্ধার করে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে।
যাকে কেন্দ্র করে এত বড় ঘটনা, সেই সালিম আনসারি অবশ্য নির্বিকার। তাঁর মন্তব্য, “হাতি আমাকে কিছুই করতে পারতো না। শুধু শুধু আমার ঘুমটা চটকে দেওয়া হলো।”
এ বিষয়ে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের সহকারী বন্যপ্রাণী সংরক্ষক নবিকান্ত ঝা বলেন, “সময় মতো বনকর্মীরা তৎপর না হলে বড় বিপদ ঘটার আশঙ্কা ছিল।” সালিমের বাবা ও স্ত্রীও বনদপ্তরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু সালিম আনসারির এই ‘ঘুমের’ ঘটনা বনকর্মীদের কাছে যে এক নতুন অভিজ্ঞতা, তা বলাই বাহুল্য।