অরুণাচলে গাড়ি ‘ গিরি ‘…কলকাতা থেকে অরুণাচল…চার চাকায় এক রম্য ট্রিপ জার্নাল … পার্থ দাশগুপ্ত কলমে | The 4th Column

অরুণাচলে গাড়ি ‘ গিরি ‘… কলকাতা থেকে অরুণাচল…চার চাকায় এক রম্য ট্রিপ জার্নাল ( তৃতীয় পর্ব )
_——_———_———_——–_——_—
আমাদের বরাদ্দ হল দোতলার উত্তরদিকের একটা বড় ঘর। তার হাফ হেক্সাগোনাল জানলা দেখেই দিল তর হয়ে গেল। মুখ বাড়ালেই একটা ছোট পুকুরোপম ডোবা (আগেকার দিনে ‘দেশ’ পত্রিকা যেমন লিখত ‘উপন্যাসোপম বড় গল্প’) আর তার চারধারে গাছগাছালি। সেখানে নাকি আফ্রিকা মুল্লুকের সেনেগাল থেকে মাইগ্রেটারি পাখি এসে শীত কাটায়। বেশ রোমহর্ষক মামলা।

—রাজাভাতখাওয়ায় সান্ধ্য চা পান

পাহাড়ি নদীর কুচো মাছ, কচিপাঁঠার কলজে, দেবদুর্লভ দার্জিলিং চা আর বিস্তর আড্ডার মধ্যেই বিকেল গড়ালো। এবারে একটু ইতিউতি উঁকি। রাতের অন্ধকার ডুয়ার্সে তীব্র হেডলাইটে ভেসে যাওয়া মসৃণ রাস্তা, দুপাশে ঝুঁকে পড়া কৌতূহলী গাছ, নদীপারের ব্রিজের উপর থেকে দূরে কালিম্পং-এর আলো, একটা একলা ভীরু রেলগেটের পাশে দাঁড়িয়ে রাতের রেলগাড়িকে যেতে দেওয়া – বেশ রাত হল। আড্ডা কি আর থামে? কিন্তু ভোর হতেই ছুটতে হবে। তাই অনিচ্ছাতেও শয্যারোহণ।

— ডুয়ার্সের দিগন্ত-ছোঁয়া কাশ বন

যত বলি, দেরি করা চলবে না, মিতা তত চোখ রাঙায়। ‘চা না খেয়ে গেরস্থবাড়ি থেকে -’ ইত্যাদি। রাহাখরচের মতো একটা মস্ত পুঁটলি গাড়িতে গুঁজে দিল মুখোপাধ্যায় দম্পতি। তাতে হপ্তাখানেকের রেস্ত। প্যাঁচামুখ করে সেই সুবিশাল খাদ্যসম্ভার নিয়ে আমাদের যাত্রা হল শুরু।
জাতীয় সড়কে উঠেই চোখ কপালে। দুপাশে কাশফুলের বন্যা আর মাঝখানে রাস্তা যেন সদ্যসমাপ্ত যুদ্ধক্ষেত্র। গাড়ির চাকা কোথায় ফেলব তার ঠিক নেই। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ‘হাটের ধূলা সয় না যে আর, কাতর করে প্রাণ’। এবারে আমি কনভিন্সড, রবীন্দ্রনাথ এ রাস্তাতেই আসাম গিয়েছিলেন। কিন্তু অচিরেই ধুলোর মেঘ কেটে গেল আর শুরু হল সঞ্জীব-বর্ণিত ‘মাখনের মতো রাস্তা’।
একটু এগোলেই আসাম সীমান্ত। প্রকৃতির বেগ আটকে রাখার মতো দাঁতে দাঁত চেপে গাড়ি চালাচ্ছি, আসামে ঢুকে তেল ভরাবো বলে। তেলের দাম লিটারে প্রায় দশ টাকা কম। চোখ জুড়োনো সবুজ আর তার মাঝে ইস্পাত রঙের রাস্তা – শহুরে অসভ্যতার বাইরে এলেই কেমন ম্যাজিকের মতো মন ভালো হয়ে যায়।

— ডিকেটি হোম স্টে… ছবির মতোই সাজানো

আইএলপি-তে লেখা ছিল বালেমু অথবা ভৈরবকুন্ড হয়ে আমাদের অরুণাচলে ঢুকতে হবে। অভীক বললে, ভৈরবকুন্ড থেকে রাস্তা সুবিধের না। তাই আমরা একটু ঘুরপথেই বালেমু হয়ে ঢুকবো ঠিক করলাম। নলবাড়ি থেকে ডানদিকে চলে গিয়েছে গৌহাটির রাস্তা। আমাদের যেতে হবে বাঁ দিকে। নলবাড়িতে আমরা একটা অল-উইমেন-রান রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাওয়া সারলাম। তারপর রঙ্গিয়া হয়ে বালেমু-র দিকে। গুগল বলছিল কাহিবাড়ি হয়ে বাঁ দিকে চলে যেতে। কিন্তু আমরা আর একটু ঘুরপাক খেয়ে রাওলি হয়ে বাঁ দিকে বেঁকে বালেমু পৌঁছলাম। ভাগ্যিস ওই রাস্তাটা নিয়েছিলাম। বাংলায় আমরা কাশফুল নিয়ে নানা আদিখ্যেতা করি। অপু দুর্গার প্রথম রেলগাড়ি দেখার দৃশ্যে কাশফুলের বন মাণিকবাবু আমাদের চিত্তপটে একেবারে পার্মানেন্ট করে দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু রাওলি হয়ে বালেমু যাওয়ার রাস্তায় কাশফুলের যা ঘনঘটা দেখলাম, তা আগে কখনো দেখিনি। আক্ষরিক অর্থেই দিগন্তছোঁয়া। মাইলের পর মাইল।

বালেমু পৌঁছতে সাড়ে চারটে বেজে গেল। সন্ধে হব হব। কাগজপত্র দেখিয়ে এবারে দিরাং-এর দিকে। এবারে শুধুই চড়াই। সবাই বললে, নাক বরাবর চলতে থাকুন। কিন্তু পাহাড় চড়া ঠিক নাক বরাবর হয় না। এতই তা ঘোরালো প্যাঁচালো। ঘন্টাদুয়েক চলার পর নামলো তোড়ে বৃষ্টি। আগের দিনই এক ছোকরা, যার সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয়, পৌঁছেছে দিরাং-এ। সে টেক্সট করে বললে, আজ আর পাহাড়ে চড়বেন না। রাস্তা খারাপ। এই বৃষ্টিতে খেই পাবেন না। স্থানীয় মানুষও বারণ কল্লে। এদিকে গাড়িতে তেল ভরাও দরকার। কিন্তু অরুণাচলে সূ্য্যি ডোবে বিকেল পাঁচটায় আর ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয় ছ’টায়।

ঝুঁকি না নিয়ে চলে গেলাম শেরগাঁও। ঘন্টাদেড়েকের পথ। হোমস্টে-র নাম ওই ছোকরাই বলে দিলে। ডিকেটি। মালিক পেমা খান্ডু অতি সজ্জন ভদ্রলোক। খুবই খাতির যত্ন করলেন। নিজের ক্ষেতের আপেল আর স্থানীয় ওয়াইন খাওয়ালেন। ভোর ছ’টায় দিরাং রওনা হওয়ার সময়ে বললেন, “আবার আসবেন। এবারে আর পিট স্টপ হিসেবে না। শেরগাঁও দেখবেন বলেই”।

ক্রমশ …

Leave a Reply

You cannot copy content of this page

error: Content is protected !!