বিশেষ কলাম https://the4thcolumn.com Fri, 28 Aug 2020 05:28:32 +0000 en-US hourly 1 https://wordpress.org/?v=5.4.2 161066102 কুড়িটাকার শ্রমজীবী ক্যান্টিন : হালহকিকত নিয়ে বিশেষ কলামে কস্তুরী গৌতম | The4thcolumn https://the4thcolumn.com/south-bengal-desk-kasturi-goutom-bishesh-column-shromojeebi-canteen/ https://the4thcolumn.com/south-bengal-desk-kasturi-goutom-bishesh-column-shromojeebi-canteen/#respond Fri, 28 Aug 2020 05:23:05 +0000 https://the4thcolumn.com/?p=7090 শ্রমজীবী ক্যান্টিন / বিশেষ কলামে কস্তুরী গৌতম
শ্রমজীবী ক্যান্টিন : লাইন দিয়ে মানুষজন

সুকান্ত সেতু পেরিয়ে ক্যাবটা ছেড়ে দিলাম। প্রথম দিন “শ্রমজীবী ক্যান্টিন” লিখে বুক করি নি। জানি, ওখান থেকে দূরত্ব সামান্যই, কিন্তু চিনি না দেখে রিক্সাওয়ালা ভরসা। স্ট্যান্ডে একটাই রিক্সা তাও আবার একটা অস্থায়ী মাস্ক-স্যানিটাইজারের দোকানের পাহারায়। দোকানদার জলত্যাগ করতে গেছেন, ফলে তিনি তখনি যেতে পারছেন না। জিজ্ঞাসা করলাম,
আর কোনো রিক্সা নেই?
আছে দিদি, কেউ ভাড়া নিয়ে গেছে, কেউ প্যাকেট আনতে।
প্যাকেট আনতে?
ওই তো, আপনি যেখানে যাবেন সেখানেই।
একটা রিক্সা ভাড়া নামিয়ে ফিরল।
তাকে দেখে পাহারায় থাকা রিক্সাওয়ালা বলল “অ্যাই, এই দিদিকে কুড়িটাকা প্যাকেটে নিয়ে যা”
অবাক হয়ে উঠে বসলাম।কুড়িটাকা প্যাকেটে মানে কুড়ি টাকা রিক্সা ভাড়া?
আরে না না, আমাদের ক্যান্টিনে খাওয়ার প্যাকেটের দাম কুড়ি টাকা তো তাই বলল।
আপনি ওখানে খান?
আমার তো কাছেই বাড়ি, তাই আমি বাড়িতেই খাই কিন্তু লাইনে যারা দূর থেকে আসে তারা নেয়।
পেট ভরে?কুড়ি টাকায় কীরকম প্যাকেট হয়!
আরে দিদি, আমি তো দেখি অনেক ভাত থাকে। কেউ কেউ একবারে শেষ করতে পারে না। তবু অন্ন তো, কেউ ফেলে না।
সঙ্গে?
ভাজা, আলু-সয়াবিন, ডিম, মাংস, মাছ একেক দিন একেক রকম। আগে ডাল দিত, এখন আর দিচ্ছে না। তার জন্য অসুবিধা হয় না।
দেখি গলির মধ্য থেকে একজন স্যান্ডোগেঞ্জি-লুঙ্গি প্যাকেট হাতে আসছে।
বললাম, কুড়ি টাকায় বেশ তো!

ও দিদি, ওরা তো ব্যবসা করে না, লকডাউনের সময় এমনিই দিচ্ছিল। তারপর সব খোলার পর রিক্সা চলতে শুরু করলে আমাদের স্ট্যান্ড থেকেই বললাম যে এখন আমরা পয়সা দিতে পারব। হোটেলে তো অনেক টাকা যায়, একটু যদি কমে হয়। আরে আমরা তো মানুষ, মানসম্মান আছে তো! ভিখারির মতো খাব কেন রোজ রোজ? যা খাব খাটনির পয়সায় কিনে খাব।
কমিউনিটি কিচেন শুরু হবার পর থেকে কানে আসছিল পার্টিটা মন্দির-মিশন হয়ে গেল নাকি? শেষ পর্যন্ত দানখয়রাতির রাস্তাতেই গেল! রিক্সাওলার কথায় স্পষ্ট হল দান আর ত্রাণের পার্থক্য।তিন মাস লকডাউন-আম্ফান পর্বে যখন এই সহনাগরিকরা কর্মহীন, তখন তাদের বাঁচার সহায়তায় বিনামূল্যে খাবার,সবজিবাজার ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবা বিতরণ ছিল ত্রাণ। অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তা প্রয়োজন ছিল। ত্রাণের প্রয়োজন যাদের ফুরিয়েছে, তাদের কাছ থেকে কুড়িটাকা অনুদান মূল্য নেওয়া হচ্ছে। যাদের এখনো প্রয়োজন আছে,কর্ম সংস্থান ফিরে পান নি,তাদের জন্য ত্রাণের বন্দোবস্তও আছে। তাই কুড়ি টাকার পাশাপাশি প্রতিদিন শ’খানেক বিনামূল্যের প্যাকেটও বিতরণ করা হয়। আশা করা হয় এই সহ নাগরিকরা একদিন নিজেদের কর্মস্থল ফিরে পাবেন। কমিউনিটি কিচেন থেকে শ্রমজীবী ক্যান্টিনের যাত্রাপথ রান্না, প্যাকেজিং ইত্যাদি কাজের জন্য ন’জন কর্মহীন মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান হয়ে উঠেছে। বলছিলেন এই কর্মকান্ডের রূপকার সুদীপ সেনগুপ্ত।
এর মধ্যেই পৌঁছে গেছি। রান্নাঘরে ঢোকার সময় হাত ,পা স্যানিটাইজ করে দিলেন স্বেচ্ছাসেবকরা। কথা বলার সময় একজন অনুরোধ করলেন, প্যাকেট বানাতে সাহায্য করতে। আমি অপটু হাতে শুরু করলাম।

সুদীপকে জিজ্ঞাসা করলাম এখান থেকে কারা প্যাকেট নিচ্ছেন?
মূলত রিক্সাচালক, অটোচালক, নির্মাণ শ্রমিক, কিছু শপিংমলের কর্মীরা আরো অনেকে। তবে এখান থেকে যে কেউ কুড়ি টাকার বিনিময়ে আগে থেকে কুপন নিয়ে তাদের খাবার সংগ্রহ করতে পারেন। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সবাই। তুমিও পারো। আমরা শ্রেণিহীন যৌথ রান্নাঘরের দিকে এভাবেই এগোতে চাই।
প্যাকেটে কী থাকে?
ভাত, যেহেতু বসিয়ে খাওয়াবার সুযোগ নেই ,একবারেই দিতে হয় তাই ভাতটা একটু বেশিই দিতে হয়।
আর?
কোনো একটা সবজি, যা দিয়ে মেখে খাওয়া যায়, আর আলু সয়াবিনের তরকারি, মাংস, কখনো মাছ ডিম এসব।
ডাল?
আগে দিতাম। কিন্তু রিক্সাওয়ালারা ট্রিপ দিতে দিতে মাঝখানে কোনো একটা সময়ে খায়। হয়তো দু-তিন ঘন্টা পরে খাবে। ততক্ষণে ডাল পচে যায়। শীতকালে আবার ভাবব।
শীতকালে? এটা কতদিন চলবে?
বন্ধ করার তো কোনো পরিকল্পনা নেই।
মাত্র কুড়িটাকায় এরকম খাবার কীভাবে সম্ভব হচ্ছে?
দ্যাখো, কুড়ি টাকায় এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সাবসিডি দিতেই হয়, সেই টাকাটা আসে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে।
কীরকম?
এখানে একটা বড় সংখ্যার পরিযায়ী শ্রমিক লকডাউনের সময় আটকে পড়েছিলেন, খাবার পাচ্ছিলেন না। তখন আমরা ঠিক করি কমিউনিটি কিচেন করব। আমরা দলের কিছু কর্মী নিজেরাই পয়সা দিয়ে শুরু করলাম, তারপর সাধারণ মানুষ যেভাবে এগিয়ে এলেন তা অভাবনীয়।প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ এগিয়ে আসছেন, দূরদূরান্ত থেকে টাকা পাঠাচ্ছেন। আবার এই সময়টায় যেহেতু কোনো সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠান হচ্ছে না সেহেতু তার জন্য বরাদ্দ অর্থটা তারা এখানে খরচ করছেন। যেমন আজকেই একজনের জন্মদিন, তিনি আজ মাংসের টাকাটা দিয়েছেন।
তা হলে আজ সকলে বিনে পয়সায় প্যাকেট পাচ্ছে?
না, ওরা কুড়ি টাকা দিয়েই নিচ্ছে, মেনুতে কিছু সংযোজন হচ্ছে। মাংস, কখনো মাছ, কখনো মিষ্টি এইসব।
কথা বলতে বলতে দেখলাম লাইন লম্বা হচ্ছে, দু-তিনটে ভ্যানে অনেক প্যাকেট তোলা হচ্ছ, জানলাম এগুলো গড়ফা, সন্তোষপুর,মুকুন্দপুর, বাঘাযতীনের সিপিআইএম পার্টি অফিসে যাচ্ছে। সেখানকার শ্রমজীবী মানুষদের জন্য। এর মধ্যে সন্তোষপুরে রান্নাঘরের নির্মাণকাজ চলছে। তখন আর সেখানে পাঠাতে হবে না।
লকডাউন-আম্ফান পর্বে রাজ্যজুড়ে সাড়ে ছ’শোর বেশি কমিউনিটি কিচেন তৈরি হয়েছিল।কিছু বন্ধ হয়ে যায়, আবার বেশ কিছু চলতে চলতে “জ্যোতিদেবী শ্রমজীবী ক্যান্টিনে উত্তীর্ণ হবার পথে। দমদমে শুরু হয়েছে “নাগরিক হেঁসেল”। ব্যাকাকপুরেও তৈরি হয়েছিল কুড়ি টাকা প্যাকেট। কিন্তু তা শাসক স্নেহধন্য স্থানীয় গুন্ডাদের তান্ডবে বন্ধ করে দিতে হয়।
কামিনী রায়ের কবিতার একটা লাইন ছোটোবেলায় খুব নিষ্প্রাণ ভাবে ব্যবহৃত হতে দেখতাম। “সকলের তরে সকলে আমরা”, আজ তাকে মূর্ত ভাবে দেখলাম। সিপিআইএম এই গোটা ব্যবস্থাপনার উদ্যোক্তা হলেও দলমত নির্বিশেষে অগনন মানুষ হাত বাড়িয়ে না দিলে এই উদ্যোগ এমন সাফল্য পেত না, তা শিরোধার্য । করোনা আর আম্ফান মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছে একা একা বাঁচা যায় না। তাই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখেও মানুষ “সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং” উপেক্ষা করে তার সহনাগরিকের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে।
লাইন শেষ, রান্নাঘর ধুয়ে-মুছে গোটানোর পালা। আমিও ফেরার পথ ধরলাম।
ভাবছিলাম একুশে নির্বাচনের ফল যাই হোক ! রান্নাঘর যেন ছড়িয়ে যেতে যেতে আরো বড় হয় !!

* লেখক একজন মুক্তচিন্তাবিদ ও শিক্ষক ।
* ছবি সৌজন্য – অন্তর্জাল

]]>
https://the4thcolumn.com/south-bengal-desk-kasturi-goutom-bishesh-column-shromojeebi-canteen/feed/ 0 7090