ট্যুরিজম https://the4thcolumn.com Sun, 19 May 2019 11:26:27 +0000 en-US hourly 1 https://wordpress.org/?v=5.1.1 161066102 কোজাগরী রাতে ঘুম জোৎস্নার দেশে : জোংরি — চারণিক বাদল জানা’র বিশেষ কলাম https://the4thcolumn.com/https-the4thcolumn-com-touism-jongri/ https://the4thcolumn.com/https-the4thcolumn-com-touism-jongri/#respond Sun, 14 Apr 2019 16:35:39 +0000 https://the4thcolumn.com/?p=416 কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে, ঘুম পাহাড়ের দেশে…
–বাদল জানা

হঠাৎই ঘুমটা ভেঙে গেলো। চারিদিক নিস্তব্ধ। হাত ঘড়ির নবটা চাপ দিলাম। ডিসপ্লেতে দেখালো রাত ১২.৪৩। আস্তে আস্তে উঠে বসলাম। স্লিপিং ব্যাগ থেকে বেরিয়ে ফেদার জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে হাটের বাইরে বেরিয়ে এলাম। অবাক হয়ে গেলাম!! চাঁদের জোৎস্নায় চারিদিক ভেসে যাচ্ছে। উফ.!! সে এক অসাধারণ দৃশ্য। চারিদিকে সাদা বরফের মেঝে।গাছগুলোও বরফে ঢাকা। চাঁদের আলো পড়ে ঝলসে যাচ্ছে চারদিক। কেমন এক মায়াবি পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। সামনে সুদৃশ্য পান্ডিম শৃঙ্গ। ঝকঝকে নীল আকাশ। কে বলবে কয়েক ঘন্টা আগেও কি তান্ডব চলেছে..!
এই দৃশ্যের জন্যই তো বারবার কষ্ট করে ছুটে আসা…

পূর্ণিমার রাতে চাঁদের ছটায় ঝলসে যাওয়া কোন পর্বতশৃঙ্গের রুপ হোক বা কোন সমুদ্রের বালুকাবেলা, তার যে কি মোহময় রূপ হয়, যে না দেখেছে, তিনি জীবনের অন্যতম সেরা দৃশ্য দেখা থেকে বঞ্চিত আছেন। বিশেষ করে তা যদি হয় দোল অথবা কোজাগরী পূর্ণিমার রাত, তাহলে সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে অতুলনীয়, লা-জবাব…

বছর দোলের ছুটিতে কোথায় যাওয়া ভাবছিলাম, হঠাৎ পারমিতার ফোন….দাদা, আমরা পাঁচ বন্ধু ট্রেকে যাওয়ার প্ল্যান করছি। তুমি আমাদের সাথে যাবে..?
কোথায় যাওয়া হবে..?
জোংরি…
আমি জবাব দিলাম…যাবো, কিন্তু একটা শর্তে, দোলপূর্ণিমায় যেতে হবে। ও সানন্দে রাজী হয়ে গেলো।
উফ!! চাঁদনী রাতে, চোখের সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য! যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।

প্ল্যানমাফিক দোলের দিন পাঁচেক আগে আমরা ছয়জন রুকস্যাক পিঠে বেরিয়ে পড়লাম এনজেপির উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে ইয়াকসুম। এখান থেকেই জোংরির উদ্দেশে আমাদের ট্রেক শুরু হবে।

শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনকন্যা ধরে সকাল নটা নাগাদ এনজেপি নামলাম। স্টেশনে নেমে প্রথমে ফ্রেশ হয়ে নেওয়া হলো। তারপর একটু চা-পান করেই বেরিয়ে পড়লাম। ঠিক হলো রাস্তাতেই আমাদের লাঞ্চ হবে। আগে থেকেই প্রভাসকে ফোনে বলা ছিলো। ওর গাড়িতেই এনজেপি থেকে ইয়াকসুম যাওয়া।

পশ্চিম সিকিমের ৫৬৪০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত ছবির মতো সুন্দর সাজানো ছোট্ট গ্রাম ইয়াকসুম। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে প্রায় ১৫০ কিমি দূরে। সরাসরি এনজেপি স্টেশন থেকে ইয়াকসুম যাওয়ার গাড়ি বুক করে যাওয়া যায়। যাতায়াত মোটামুটি ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার মতো পড়ে। সাত থেকে আটজনের বসার ব্যবস্থা। অথবা এনজেপি থেকে শেয়ারে জোড়থাং। সেখান থেকে আবার শেয়ারে ইয়াকসুম, এইভাবেও যেতে পারেন। সময় লাগবে প্রায় ছয় থেকে আট ঘন্টা মতো।

সেবক পেরিয়ে তিস্তাকে সাথে নিয়ে, বিখ্যাত করোনেশন ব্রিজ (বাঘ পুল) ছাড়িয়ে, মেল্লি, জোড়থাং, লেগশিপ, তাশিডিং হয়ে ইয়াকসুম পৌঁছাতে প্রায় শেষ বিকেল। ততক্ষণে আকাশের মুখ ভার হতে শুরু করেছে। গাড়ি থেকে নেমে আমাদেরও মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ইসস.!! এত কষ্ট করে এসে যদি কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখ না দেখতে পাই। আসলে এই সময়ের ওয়েদার অনেকটা অনিশ্চিত। হয়তো খুব ভালো হলো অথবা বৃষ্টিও হতে পারে। আর যত ওপরে উঠবেন তত বৃষ্টির বদলে বরফ পড়া পাবেন। সেইভাবে নিজেদের তৈরি করে আসা।

ইয়াকসুমে আমরা ছিলাম প্রধান লজে। এখানে ৭০০/১০০০ এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ডাবল বেড ও ট্রিপল বেডের রুম পাওয়া যায়। হোটেলে উঠে প্রথমেই ফোন করলাম আমাদের ট্রেকের গাইড বাগবীর সুব্বাকে। আগামী পাঁচদিন এনার তত্ত্বাবধানে আমাদের থাকতে হবে। বাগবীর সুব্বা কিছু পরেই হোটেলে এসে হাজির। তার সাথে সব কথা ফাইনাল হয়ে গেলো। ঠিক হলো দিন পিছু আমাদের থেকে ১৪০০ টাকা করে নেবে। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, সন্ধ্যাবেলা স্ন্যাকস, ডিনার, টেন্ট, স্লিপিং ব্যাগ এবং কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশনাল পার্কে এন্ট্রি ফি সহ। এমনকি আমাদের স্যাকও ক্যারি করতে হবে না। ওরাই ইয়াকের পিঠে করে বয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু আমরা নিজেরাই আমাদের স্যাক ক্যারি করব, বললাম। তার কারণ হল, ট্রেকিংয়ের সময় পিঠে স্যাক থাকা ভীষণ জরুরি। ভালো ব্যালেন্স হয় আর প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র সাথে থাকে।
সুব্বাজি আমাদের সব বুঝিয়ে, পরেরদিন সকাল সাতটা নাগাদ রেডি থাকতে বলে চলে গেলেন।
পরেরদিন সকালে আমরা সবাই রেডি হয়ে সাতটা নাগাদ হোটেলের নিচে নেমে এলাম। সুব্বাজিও তার দলবল নিয়ে যথা সময়ে হাজির। আমাদের সাথে সুব্বাজি ছাড়াও, একজন পোর্টার, একজন কুক আর একজন ইয়াকম্যান যাচ্ছে। তার সাথে দুটো ইয়াক। ইয়াকের ওপর বেশীরভাগ মালপত্র লোড করা। বাকিটা পোর্টার আর কুক নিয়েছে।
প্রথমেই আমরা আমাদের ডকুমেন্টস নিয়ে (ভোটার বা আধার কার্ডের জেরক্স, এক কপি করে ফোটো) থানায় হাজির হলাম। ওখানে একটা সাদা কাগজে অফিসার ইনচার্জকে অ্যাড্রেস করে আবেদনপত্র লিখতে হবে। সেই আবেদনপত্রে টিমের প্রত্যেকের নাম এবং কদিনের জন্য ট্রেক হবে, কতদূর যাবেন, সমস্ত লিখতে হবে। সাথে পরিচয়পত্রের জেরক্স আর ফটো অ্যাটাচ করে দিতে হবে। সেই আবেদনপত্রটি ওরা রিসিভ করে স্ট্যাম্প মেরে অনুমতি দেবেন।

ইয়াকসুম থেকে কিছুটা যাওয়ার পরেই আপনি কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশনাল পার্কে প্রবেশ করছেন। জোংরি তার মধ্যেই পড়ে। পার্কে প্রবেশের আগে একটা চেকপোস্ট আছে। সেখানে থানার অনুমতি পত্র দেখাতে হবে ও জনপ্রতি এন্ট্রি ফি জমা করতে হবে। তারা আপনাকে একটা ব্যাগ দেবে। চলার পথে যা ওয়েস্টেজ পাবেন সব ওই ব্যাগে করে নিয়ে এসে ফেরার সময়ে জমা করতে হবে।
মনে রাখতে হবে সিকিম হলো দেশের অন্যতম সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাজ্য। এখানে সম্পূর্ণভাবে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ এবং ওপেন প্লেসে ধুমপান নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে বেশ ভালো রকমের জরিমানা। এছাড়াও দেশের একমাত্র রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত রাজ্য যারা অরগানিক চাষবাস করে। এবং রাজ্যের প্রতিটা মানুষ এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন।
সমস্ত ফর্মালিটি শেষ করে আমরা সকাল সওয়া আটটা নাগাদ যাত্রা শুরু করলাম। আজ আমাদের গন্তব্য সাচেন। পুরো রাস্তাটাই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলা। পথিমধ্যে আজ দুটো নদী পেরোতে হবে। প্রচুর নাম না জানা পাখির ডাক আর নানারকম রঙিন জংলি ফুলের সমারোহ আমাদের মুগ্ধ করে দিয়েছে। ধীরে ধীরে আমরা চলতে লাগলাম। প্রথমদিন সবারই একটু কষ্ট হয়। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে সমতল থেকে এতটা উচ্চতায় আসার ফলে শরীরকেও পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে সময় লাগে।

সুব্বা আমাদের সাবধান করে দিয়েছিল, শর্টকাট রাস্তায় না যেতে, একসাথে থাকতে। গভীর ঘন জঙ্গল হওয়ার দরুণ রাস্তা হারানোর ভয় থাকে, দ্বিতীয়ত এইসব জায়গায় ভাল্লুক বা চিতা প্রায়ই বেরিয়ে আসে। আমরা নিজেদের মধ্যে যতটা সম্ভব আস্তে কথা বলে একসাথেই এগোচ্ছিলাম। পাহাড়ে চলাকালীন বেশি কথা বলা পছন্দ নয়। এক তো দমের ঘাটতি হয়, তাছাড়াও পাহাড়ের নিজস্ব একটা সুর আছে, কথা আছে, পাখির ডাক, ঝর্ণার শব্দ…সবমিলিয়ে আলাদা একটা অনুভূতি আছে, যেগুলোর আস্বাদ প্রাণভরে নিতে হয়।
প্রায় এক দেড় ঘন্টা হাঁটার পরে প্রথম ব্রিজ পেলাম। মোটা তারের সাসপেনশন ব্রিজ। একজন করে পারাপার করতে বলল। ব্রিজে উঠলেই দুলতে শুরু করে। নিচ দিয়ে খরস্রোতা নদী। দাঁড়িয়ে কয়েকটা ছবি নিয়েই আবার চলতে শুরু করলাম। বেলা বাড়তে লাগলো। ক্রমশ উঠে যাওয়া। দ্বিতীয় ব্রিজ ক্রশ করে বেলা দেড়টা নাগাদ সাচেন ( উচ্চতা ৭২০০ ফিট) পৌঁছালাম।
লাঞ্চ করার পরেই শুরু হলো ঝিরঝিরে বৃষ্টি, ঠান্ডা লাগতে লাগলো৷ ততক্ষনে আমাদের টেন্ট রেডি৷ মালপত্র নিয়ে টেন্টে ঢুকে পড়লাম। সারাদিনের হাঁটার ক্লান্তিতে একটু পরে ঘুমিয়ে পড়লাম। বাইরে তখন বেশ বৃষ্টি। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ সুব্বার ডাকে টেন্টের বাইরে বেরিয়ে এলাম। ডিনার রেডি। বৃষ্টিও থেমে গেছে। সাদা ভাত, রুটি, ডাল, পাঁপড়, আলু ক্যাপসিকামের তরকারি, চিকেন কারি আর স্যালাড দিয়ে জম্পেশ করে ডিনার। আকাশ একটু ক্লিয়ার। চাঁদের মুখ দেখা দিয়েছে। ডিনার সেরে টেন্টের বাইরে বসা হলো। পরেরদিনের হাঁটা, নানারকম কথা আড্ডা ইত্যাদি করতে করতে রাত প্রায় দশটা। এরমধ্যে আবার আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। টেন্টে ঢুকে স্লিপিং ব্যাগে চালান হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পরেই আবার বৃষ্টি শুরু হলো।
পরেরদিন সকাল ছটায় আমাদের পোর্টার চা নিয়ে সুপ্রভাত জানালো। চা খেয়ে, ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্টের জায়গায় হাজির হলাম। ব্রেকফাস্ট সেরে আমাদের ট্রেক শুরু হলো। আজ আমাদের গন্তব্য বাখিম (৮৬৫৪ ফিট) হয়ে সোকা।

সকাল আটের মধ্যেই আমরা রওনা দিলাম। প্রতিদিন দুপুর আড়াইটের পর থেকেই ওয়েদার খারাপ হতে শুরু করছে। তাই আমাদের টার্গেট থাকতো যেভাবেই হোক বেলা দেড়টা থেকে দুটোর মধ্যে পরের ক্যাম্প সাইটে পৌঁছানো। বেশ কিছুটা হাঁটার পরে একটা ছোট্ট কংক্রিটের ব্রিজ পড়ে। সেই ব্রিজটা ক্রশ করে কিছুদূর যাওয়ার পরে পাহাড়ের পাকদণ্ডি বেয়ে একজনকে নেমে আসতে দেখলাম। জিজ্ঞাসা করলাম বাখিম কতদূর..?
উল্টো দিকের পাহাড়ের মাথাটা দেখিয়ে বলল, উপর হ্যায়…
বুঝতে পারলাম, পরের এবং এই রুটের শেষ ব্রিজটা একটু পরেই পাওয়া যাবে। সারা রাত বৃষ্টির জন্য রাস্তা খুব খারাপ হয়ে আছে। জল, মাটিতে পুরো রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে আছে। মাঝে মাঝে কয়েকটা জায়গায় খুব সাবধানে পার হতে হচ্ছে। আজকের রাস্তাটা কালকের চেয়ে একটু বেশি চড়াই। কিছুটা যাওয়ার পরে রাস্তা আস্তে আস্তে নীচের দিকে নামতে শুরু করলো, আর জলের আওয়াজ ক্রমশ বাড়তে লাগলো। বুঝলাম নদীর পারের দিকে চলেছি। সবাই মোটামুটি একটু গ্যাপ রেখে হাঁটছি। যাতে একজন স্লিপ করে অন্যজনের ওপর গিয়ে না পড়ে। প্রত্যেকের হাতে ওয়াকিং স্টিক, ব্যালেন্স রাখার জন্য। যেহেতু ঘন জঙ্গলের রাস্তা, বর্ষা হলে বড্ড জোঁকের উৎপাত শুরু হয়। তাই সেদিকেও খেয়াল রেখে চলতে হচ্ছে, মাঝে মাঝেই মোজার দিকে নজর রেখে চলেছি। কিছুদূর গিয়ে ব্রিজটা নজরে পড়লো। পাথুরে ঢালু রাস্তাটা সাবধানে নেমে এলাম। ব্রিজের ওপর গিয়ে সবাই লাইন হয়ে দাঁড়ালাম। নীচ দিয়ে গর্জন করে জলরাশি বয়ে চলেছে। ক্রিস্টাল ক্লিয়ার নীল জল। দুদিকের অপরূপ সৌন্দর্য। মুগ্ধ হয়ে সবাই দেখছি। ভীষণ লোভ লাগছিল ব্রিজের পাশ দিয়ে নদীতে নামার। কিন্তু গাইড বারণ করলো। কিছুক্ষণ ফটো শেসন চলল। ক্রশ করে ওপারে গিয়ে মিনিট কয়েকের বিশ্রাম। প্রচন্ড গরম লাগছে। ভেতরের গেঞ্জী ঘামে ভিজে গেছে। উইন্ডচিটারটা খুলে স্যাকে ভরলাম। জল খেয়ে মুখে একটা চকলেট ফেলে আবার চলা শুরু। এবার টানা চড়াই। বেশ স্টিফ।

প্রায় ঘন্টা খানেক উঠে আসার পর বাখিম পৌঁছালাম। একটা মিষ্টি ছোট্ট জায়গা এই বাখিম। বাখিমে একটা বেশ বড় দোতালা ট্রেকার্স হাট আছে। আগে ‘এইচ এম আই ‘ এর ক্যাম্প সাইট ছিল। কিন্তু পরে ভূমিকম্পে পুরো বিল্ডিংটায় ফাটল ধরে যায়। এখন ওটা পরিত্যক্ত। একটু নীচে পাহাড়ের ঢালে একটা ছোট্ট ট্রেকার্স হাট আছে। চৌকিদার থাকে। সাথে লাগোয়া একটা কাঠের ঘর আছে। মাথাপিছু একশ টাকার বিনিময়ে সেখানে থাকা যায়। খাওয়া খরচ আলাদা। আমরা সেখানে চা আর স্যুপ খেয়ে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। ছবি তোলাও চলল। খুব সুন্দর জায়গাটা। ট্রেকার্স হাটের বাইরে কিছুটা ফাঁকা সমতল জায়গা করা হয়েছে। বসার জন্য সুন্দর কাঠের ছাতা বানানো। তার পরেই সোজা খাদ নেমে গেছে অনেক দূর অবধি।
বাখিমে প্রায় চল্লিশ মিনিট কাটাবার পরে আমরা আবার চলা শুরু করলাম। পুরোটাই চড়াই। প্রায় বেলা একটা নাগাদ সোকা (৯৭০০ ফিট) পৌঁছালাম। সোকা জায়গাটা বাখিমের তুলনায় বেশ বড়। একটা ছোট্ট বুগিয়াল আছে। পাশে কয়েকটা ঘরও আছে। মেষপালকরা সেখানে থাকে। সোকার একটু ওপরের দিকে একটা ছোট্ট মনাস্ট্রি আছে, পাশে একটা ছোট্ট লেক। একটা ট্রেকার্স হাট আছে। আর আছে গোটা চারেক মতো প্রাইভেট লজ। আজ সোকাতেই আমাদের দ্বিতীয় রাত্রিবাস। পৌঁছে, ফ্রেশ হয়ে নিলাম। জায়গাটা একটু ঘুরে দেখা হলো। আকাশের মুখ ভার হতে শুরু করেছে৷ পাল্লা দিয়ে ধীরে ঠান্ডা হাওয়া বইতে লাগলো। কিছু পরেই ট্রেকার্স হাটের ডাইনিংয়ে লাঞ্চ সার্ভ করা হলো। ততক্ষণে বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমরা গরম গরম খাবার খেয়ে টেন্টে গিয়ে ঢুকলাম। বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে।
সন্ধ্যা নাগাদ টেন্টের মধ্যে বসে আছি। স্লিপিং ব্যাগ জড়িয়ে গল্প হচ্ছে। বাইরে তখনো বৃষ্টি ঝরেই চলেছে। তার মধ্যেই পোর্টার গরম চা আর পকোড়া দিয়ে গেলো। আমাদের সাথে মুখ চালাবার মতো ভাজা চিঁড়ে ছিলো। ব্যস ! চিঁড়েভাজা, পকোড়া আর গরম চা দিয়ে বেশ জমিয়ে আড্ডা চলল।
রাত আটটা নাগাদ ডিনার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। বাইরে বৃষ্টি অব্যাহত।

পরেরদিন সকাল আটটা নাগাদ আমরা জোংরির উদ্দেশে রওনা দিলাম। আজ রাস্তা বেশ লম্বা। পৌঁছাতে বিকেল হয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের প্যাক লাঞ্চ দেওয়া হলো। জ্যাম দেওয়া স্লাইস পাউরুটি, ডিম সেদ্ধ, আলু সেদ্ধ, ক্যাডবেরি, একটা আপেল আর একটা বিস্কিটের প্যাকেট।
গ্রামের মধ্যে চলার রাস্তার ওপরেই একটা চোর্তেন। আমাদের ইয়াকম্যান, নাম বাইচুং ভুটিয়া, বললো, চোর্তেনকে ডানদিকে রেখে এগিয়ে যেতে৷ এটা নাকি শুভ লক্ষ্মণ৷ ওদের সংস্কার। যথারীতি ওর কথা মেনেই আমরা এগিয়ে চললাম। আমাদের গাইড আবার মনে করিয়ে দিলো, কোন শর্টকাট নয়। একটাই ট্রেইল। সেটা ধরে এগিয়ে যেতে হবে। ওরা সমস্ত মালপত্র প্যাক করে আসছে৷ রাস্তাতেই আমাদের ধরে ফেলবে। আমরা স্যাক পিঠে এগিয়ে চললাম।

সোকা গ্রাম থেকে কিছুটা বেরিয়েই সোজা রাস্তা উপরের দিকে উঠে গেছে৷ কিছুটা গিয়েই দেখতে পেলাম দুটো রাস্তা দুদিকে গেছে। আমাদের বাঁদিকে একটা ট্রেইল জঙ্গলের দিকে চলে গেছে। বেশ সুন্দর করে কাঠের তক্তা দিয়ে মাটিকে বাঁধ দিয়ে সিঁড়ির মতো ট্রেল করা। আর সামনের দিকে জঙ্গলের মধ্যে আরেকটা ট্রেইল চলে গেছে। আমরা ভাবলাম, সামনের ট্রেইলটা হয়তো শর্টকাট। বাঁধানো ট্রেইলটাই আসল ট্রেইল। আমরা সেটা ধরেই উঠতে লাগলাম। একটু পরে দেখি রাস্তাতে কাল রাতের নতুন বরফ পড়েছে। প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর রাস্তাটা এসে একটা খোলা জায়গায় গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। সামনে আর কোন রাস্তা দেখতে পাচ্ছি না। চারিদিকে রডোডেনড্রন গাছ আর জংলী কাঁটা গাছ। হঠাৎ জায়গাটা কুয়াশায় ঢেকে গেলো। কিছু দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের গাইডেরও কোন পাত্তা নেই। বেশ কয়েকবার জোরে নাম ধরে ডাকলাম। কোন সাড়াশব্দ নেই। একটু ভয় লাগতে লাগলো। নির্ঘাত আমরা রাস্তা হারিয়েছি। সবাই মিলে ঠিক করলাম এখানে অপেক্ষা না করে আমরা বরঞ্চ সোকার দিকে ফিরে যাই যেখানে রাস্তাটা দুটো ভাগ হয়ে গিয়েছিল। সেইমতো আমরা আগের জায়গায় ফিরে আসি। নীচ থেকে তখন অন্য একটা গ্রুপের পোর্টাররা উঠছে৷ তাদের সব বললাম। ওরা বলল আমরা ভুল করেছি। যেই রাস্তাটা সামনের দিকে জঙ্গলে চলে গেছে, ওটাই জোংরি যাওয়ার আসল রাস্তা। আমরা ভুল পথেই গিয়েছিলাম। প্রায় দু ঘন্টা সময় ততক্ষণে পার হয়ে গেছে। আবার নতুন করে ওঠা শুরু করলাম।

যত ওপরে উঠছি দেখি রাস্তায় বরফের চাদর। নতুন বরফে পা পিছলে যাচ্ছে। গাছের মাথা থেকে বরফ ঝরে গায়ে পড়ছে। আকাশের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। যখন তখন ওয়েদার খারাপ হয়ে যেতে পারে। বেশ কিছুটা ওঠার পরে দেখি আমাদের গাইড আমাদের খোঁজেই নিচে নেমে আসছে। সে নাকি অনেকটা ওপরে উঠে গিয়েছিলো। আমাদের দেখতে না পেয়ে সেও অবাক হয়ে আবার নিচে নেমে আসছে। আমরাও তাকে দেখে আশ্বস্ত হলাম। পুরো বিষয়টা বললাম। সেও নিজের ভুল স্বীকার করলো। আসলে সে নিজেও জানতো না এই ট্রেলটার কথা। ট্রেলটা নাকি সিজন বন্ধের সময় নতুন হয়েছে। যে খোলা জায়গায় গিয়ে আমরা দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম, সেখানে নাকি ক্যাম্পিং করা হয়। যারা পাখি ও রেড পান্ডা দেখার জন্য আসে, ওখানে ক্যাম্প করে থাকে।
যাইহোক আবার চলা শুরু করলাম। কিন্তু ট্রেইলে বরফের পরিমাণ যথেষ্ট। পা গোড়ালি অবধি ডুবে যাচ্ছে। বরফ, জল আর কাদায় ট্রেইলের অবস্থা এতটা খারাপ যে চলাই প্রায় কষ্টকর হয়ে উঠছে। চলার গতিও অনেক কম। তার ওপর একটানা উঠে যাওয়া। শরীর ক্লান্ত হয়ে আসছে। একটু পরেই হালকা বরফ পড়া শুরু হলো। ঠান্ডায় হাত প্রায় জমে আসছে। এর মধ্যে বার কয়েক বরফে পা স্লিপ করে পড়েছি। খুব বিধ্বস্ত অবস্থা। বেলা প্রায় তিনটে নাগাদ ফেদাংয়ে (১২০৮৩ ফিট) এসে পোঁছালাম। সকালবেলাই রাস্তা ভুলের জন্য প্রচুর সময় নষ্ট হয়েছে। দিনের শুরুতেই ম্যাক্সিমাম হাঁটা যায়। পরে সময় বাড়ার সাথে সাথে শরীর ক্লান্ত হয় আর চলার গতিও কমে আসে। ফেদাং জায়গাটা একটা সমতল ভূমি। ছোট্ট সুন্দর ট্রেকার্স হাট আছে। এখান থেকে পান্ডিমকে বেশ ভালো দেখা যায়। খুব প্রয়োজন না পড়লে কেউ এখানে রাত্রিবাস করে না। সবাই সোকা থেকে সরাসরি জোংরি যায়। আমরা যখন ফেদাংয়ে গিয়ে পৌঁছালাম তখন ওয়েদার বেশ খারাপ হয়েছে। বরফ পড়াও শুরু হয়েছে। আমরা ট্রেকার্স হাটে গিয়ে উঠলাম। সাথে যে লাঞ্চ প্যাক ছিলো সেগুলো বের করে খেতে শুরু করলাম৷ প্রায় ঘন্টাখানেক পর ওয়েদার সামান্য ক্লিয়ার হলো। আমরা ঠিক করলাম এখনি বেরিয়ে পড়তে হবে, নাহলে এরপর জোংরি যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিকেল প্রায় চারটে নাগাদ ফেদাং থেকে জোংরির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম।
কিছুটা যাওয়ার পরে ওয়েদার আবার খারাপ হতে শুরু করলো। এত কুয়াশায় ঘিরে ধরলো যে এক হাত দূরও দেখা যাচ্ছে না। সাথে শুরু হলো বরফ পড়া। আমরা অনেক কষ্টে কোন রকমে উঠতেই লাগলাম। শুধু সামনের লোকের পায়ের ছাপ দেখে এগিয়ে চলেছি৷ কোনদিকে যাচ্ছি, সামনে কি আছে, কিছুই বুঝছি না। প্রাণান্তকর চড়াই পেরিয়ে উঠে এলাম দেওরালি টপে। এরপরে প্রায় সমতল কিছুটা হাঁটার পরে জোংরি ( ১৩০২৪ ফিট)। সেদিন আর আমরা টেন্টে থাকিনি। কারোর শরীরই ঠিক ছিলো না। খুব ক্লান্ত ছিলাম। তাই আমরা ঠিক করেছিলাম ট্রেকার্স হাটেই থাকবো। সেইমতো রাতের খাওয়ার খেয়ে হাটে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়লাম। ক্লান্তিতে চোখ জুড়িয়ে এলো।

তারপরই এলো সেই সন্ধিক্ষণ। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেলো, আর হাটের বাইরে বেরিয়ে এক অভাবনীয় দৃশ্য.!!
আগেরদিন রাতেই কথা হয়েছিলো, ওয়েদার ভালো হলে ভোর উঠে জোংরি টপে যাওয়া হবে, সূর্যোদয় দেখতে। সেইমতো অন্ধকার থাকতে আমরা সবাই উঠে জোংরি টপে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিলাম। সুব্বাকে সাথে নিয়ে টর্চ জ্বেলে চলতে লাগলাম। রাস্তায় প্রচুর বরফ। তার মধ্যেই টাল খেতে খেতে কোন মতে উঠছি। আকাশের রঙ আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে। হালকা নীল থেকে সিঁদুরে রঙ ধরছে। কিন্তু বরফ এতটাই বেশি যে পুরো টপ অবধি পৌঁছাতেই পারলাম না। কিছুটা নিচেই দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য হলাম। চোখের সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘার রং পাল্টাতে লাগলো। প্রথমে হালকা নীল, তারপর হালকা লাল, আগুনে লাল, বেগুনি…বিভিন্ন রংয়ের খেলা। অপলক চোখে দেখছি প্রকৃতির এই ভোজবাজি। চারিদিকে কি প্রশান্তি.!! সুউচ্চ এই গিরিশ্রেণীর সামনে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করি, আমরা নিজেদের বড়াই করি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাণী হিসাবে, অথচ প্রকৃতির কাছে আমরা কত তুচ্ছ, কত নগণ্য.!! আমাদের চারদিকে এত হিংসা, লোভ লালসা, যন্ত্রণা…সব কিছু যেন এখানে এসে বিলীন হয়ে যায়। এক অপার শান্তি বিরাজ করে…এই জন্যই তো বারবার ছুটে আসা, নতুন করে বাঁচতে শেখা, প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া.!!
বেশ কিছুক্ষণের জন্য সম্বিত হারিয়ে ফেলেছিলাম। নিজের মধ্যে ফিরে এলাম। প্রণাম জানিয়ে এলাম প্রকৃতি মা’কে। আবার ফিরে আসার অঙ্গীকার করে।
জোংরি টপ থেকে নেমে এলাম জোংরিতে। এবার ফেরার পালা। ব্রেকফাস্ট করে স্যাক গুছিয়ে রওনা দিলাম নিচের দিকে। আজ চতুর্থ দিন আমাদের বাখিমে থাকা।

পরেরদিন সকালে বাখিম থেকে রওনা দিয়ে সোজা ইয়াকসুমে। ভারাক্রান্ত মনে ফিরে এলাম। আবার সেই ইঁটপাথরের জঙ্গল। আবার সেই হিংসা লোভ লালসার পরিবেশ। আবার সেই দেশপ্রেমিক বনাম দেশদ্রোহীর উন্মাদনার হাতে ফিরে যাওয়া !
উপায়ই বা কি আছে..?
পাহাড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্যই তো বারবার সমতলে ফিরে আসা…

লেখক — চাকুরীজীবি, চারণিক, মোটরসাইকেল ভ্রামণিক ও সমাজসেবী

]]>
https://the4thcolumn.com/https-the4thcolumn-com-touism-jongri/feed/ 0 416